উদ্বেগের মধ্যেই হান্টাভাইরাসের প্রকোপে পড়া জাহাজের যাত্রীরা বন্দরে
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগের মধ্যেই প্রাণঘাতী হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পড়া আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়া ক্রুজ শিপ এমভি হোন্ডিয়াসের আরোহীরা স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছেন। নিজ নিজ দেশে ফেরার উদ্দেশে আজ রোববার (১০ মে) জাহাজটি থেকে নেমে এর আরোহীরা কঠোর সাবধানতার মধ্যে ইতোমধ্যে যাত্রাও শুরু করেছেন।
হান্টাভাইরাসের প্রকোপে পড়া এমভি হোন্ডিয়াস জাহাজের তিনজন যাত্রী—একজন ডাচ দম্পতি এবং একজন জার্মান নারী—ইতোমধ্যেই মারা গেছেন; অন্যদিকে বিরল এই রোগে আরও অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, যা সাধারণত ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ায়। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
হান্টাভাইরাস আর্জেন্টিনায় একটি স্থানীয় রোগের কারণ এবং সেখান থেকেই গত এপ্রিলে জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছিল। এই ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক বা নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের জন্য এর ঝুঁকি অত্যন্ত কম এবং কোভিড-১৯ মহামারীর পুনরাবৃত্তির মতো তুলনার বিষয়টিকে তারা নাকচ করে দিয়েছেন।
স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া জানিয়েছেন, জাহাজের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রুর অধিকাংশকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য শেষ ফ্লাইটটি আগামীকাল সোমবার অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হবে, এরপর জাহাজটি নেদারল্যান্ডসের দিকে যাত্রা করবে। নীল রঙের মেডিকেল স্যুট পরা যাত্রীরা ছোট নৌকায় করে তেনেরিফের গ্রানাডিলা বন্দরে পৌঁছানোর জন্য ডাচ পতাকাবাহী জাহাজটি থেকে নামতে শুরু করেছেন বলে এএফপি সাংবাদিকরা জানিয়েছেন। এরপর নেমে আসা ব্যক্তিরা বাসে করে তেনেরিফে সাউথ বিমানবন্দরে যান, যেখান থেকে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে ফ্লাইটগুলোর ছেড়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।
স্পেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় টেলিগ্রামে নিশ্চিত করেছে যে, যাত্রী এবং স্প্যানিশ ক্রু সদস্যদের জাহাজ থেকে নামানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী গার্সিয়া জানান, জাহাজে থাকা ১৪ জন স্প্যানিশ নাগরিক প্রথমে নামবেন, এরপর একটি ডাচ ফ্লাইটে জার্মানি, বেলজিয়াম, গ্রিস ও ক্রু সদস্যদের একাংশকে নিয়ে যাওয়া হবে। এছাড়া আজ রোববার কানাডা, তুরস্ক, ফ্রান্স, ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড এবং মার্কিন নাগরিকদের জন্য আলাদা ফ্লাইটের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
হান্টাভাইরানস নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
আটলান্টিক দ্বীপপুঞ্জটির আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ জাহাজটিকে অভ্যর্থনা জাননোর বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে বাধা দিয়ে আসছিল; ফলে জাহাজটিকে বন্দরে ভেড়ার বদলে উপকূলের কিছুটা দূরে নোঙর করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে তেনেরিফে সাংবাদিকদের স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী গার্সিয়া বলেন, জাহাজের সব যাত্রী বর্তমানে উপসর্গহীন এবং জাহাজ থেকে নামার আগে তাদের চূড়ান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে।
স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলেছে, তেনেরিফের স্থানীয় জনগণের সাথে জাহাজের যাত্রীদের কোনো ধরনের যোগাযোগ হবে না। গ্রানাডিলায় এএফপি সাংবাদিকরা জেটির পাশে সাদা তাঁবু খাটাতে এবং পুলিশকে (যাদের কেউ কেউ সুরক্ষা স্যুট পরে ছিলেন) ছোট এই শিল্প বন্দরের অংশবিশেষ সিলগালা করে দিতে দেখেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস এই সূক্ষ্ম তৎপরতাটি তদারকি করতে স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে রয়েছেন। আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে যে, আগামী সোমবারের মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে সক্ষম হান্টাভাইরাসের একমাত্র ধরন ‘আন্দেস ভাইরাসের’ সংক্রমণ জাহাজটির আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরের নিশ্চিত হওয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুক্রবার জানিয়েছে যে, তারা আটটি সন্দেহভাজন ঘটনার মধ্যে ছয়টি নিশ্চিত করেছে। জাহাজে বর্তমানে আর কোনো সন্দেহভাজন রোগী নেই।
এমভি হোন্ডিয়াস আজ রোববার ভোরে কেপ ভার্দে থেকে তেনেরিফে পৌঁছায়; এর আগে সপ্তাহের শুরুর দিকে কেপ ভার্দে থেকে তিনজন আক্রান্ত ব্যক্তিকে ইউরোপে স্থানান্তর করা হয়েছিল। জাহাজটি ১ এপ্রিল আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে কেপ ভার্দে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বাস করে, প্রথম সংক্রমণটি অভিযান শুরুর আগেই ঘটেছিল এবং পরে জাহাজের ভেতরে মানুষের মাধ্যমে এটি ছড়িয়েছে। তবে আর্জেন্টিনার প্রাদেশিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হুয়ান পেটরিনা বলেছেন, ভাইরাসের কয়েক সপ্তাহের সুপ্তিকালসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করলে প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে জড়িত সেই ডাচ ব্যক্তির উশুয়াইয়া থেকে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
জানা গেছে, বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে জাহাজ থেকে নেমে যাওয়া যাত্রী এবং তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক