ইরান যুদ্ধের কারণে আকাশছোঁয়া ওষুধের দাম, বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে যেসব দেশ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ বিশ্ববাজারে প্রায় সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে তেল, গ্যাস ও সারের বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বর্তমানে এর প্রভাব পড়েছে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ খাতে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ থেকে শুরু করে গর্ভনিরোধক সামগ্রী—সবকিছুর দামই এখন আকাশছোঁয়া।
কেন বাড়ছে ওষুধের দাম
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ অবরোধ করে রেখেছে। এই পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওষুধ শিল্প মূলত পেট্রোকেমিক্যাল ফিডস্টকের ওপর নির্ভরশীল, যার একটি বড় অংশ আসে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। ফলে কাঁচামাল সংকটে ওষুধের উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার জানান, দুবাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাবগুলো যুদ্ধের কারণে নাজুক হয়ে পড়েছে। অনেক ওষুধের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ‘কোল্ড চেইন’ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, যা বর্তমানে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আকাশপথে পরিবহণ ও সরবরাহ ঝুঁকি অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উটার ডিউলফ সতর্ক করে বলেছেন, প্রায় ৩৫ শতাংশ ওষুধ ও ৯০ শতাংশ জরুরি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও টিকা আকাশপথে পরিবহণ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ থাকা ও জেট ফুয়েলের সংকটের কারণে বৈশ্বিক আকাশপথের পণ্য পরিবহণের প্রায় ২২ শতাংশ বর্তমানে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এর ফলে ওষুধের দামের চেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে সরবরাহ বিলম্ব ও পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে যেসব দেশ
১. ভারত : দেশটি ওষুধ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হলেও কাঁচামালের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ভারত বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়বে।
২. গ্লোবাল সাউথ ও আফ্রিকা : সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোর আর্থিক সামর্থ্য কম ও তাদের ওষুধের মজুত নেই বললেই চলে। ফলে এসব দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে।
৩. সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল : লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনের মতো মানবিক সংকটে থাকা দেশগুলোতে ওষুধের আকাল দেখা দিতে পারে।
৪. উপসাগরীয় দেশ : দুবাই বা দোহার মতো কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ক্যানসারের ওষুধ বা কোল্ড-চেইন নির্ভর ওষুধের আমদানি ব্যাহত হচ্ছে।
বিপরীতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব হাইড্রোকার্বন ও পেট্রোকেমিক্যাল সুবিধার কারণে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ‘সলিডারিটি মেকানিজম’ বা কৌশলগত মজুত ব্যবস্থার কারণে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের প্রকৃত ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
কোন কোন ওষুধের দাম বেড়েছে?
ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্য ও ভারতের বাজারে সাধারণ ওষুধের দামে বড় প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
ভারত : সাধারণ ব্যথানাশক প্যারাসিটামলের দাম প্রায় ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেমিস্টরা জানাচ্ছেন, কাঁচামালের দাম বাড়ায় এটি আরও ৩০-৪০ শতাংশ বাড়তে পারে।
যুক্তরাজ্য : ফার্মেসিগুলোতে সাধারণ ওষুধের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষ করে প্যারাসিটামলের দাম কোথাও কোথাও চারগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক