মিরপুর টেস্ট
ব্যাটিং বিপর্যয় আর ক্যাচ মিসের মাশুল দিয়ে হারল বাংলাদেশ
দিনের প্রথম সেশনে বাংলাদেশের ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল, উইকেটে সবটাই যেন বোলারদের জন্য। জোমেল ওয়ারিকান-রোস্টন চেজরা স্পিন ঘূর্ণিতে পরাস্ত করছিলেন বাংলাদেশের ব্যাটারদের। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাটিংয়ে নামতেই বদলে গেল চিত্র। উইকেট হয়ে উঠল ব্যাটিং সহায়ক। অনেকটা ওয়ানডে স্টাইলে ব্যাটিং করে গেলেন ক্যারিবীয়ান ব্যাটাররা। বাংলাদেশ যেন কোনো প্রতিরোধই গড়তে পারলেন না। এরপর ওপরই ক্যাচ মিস তো আছেই। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। হার দিয়ে সিরিজ শুরু হলো বাংলাদেশের।
আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) মিরপুর শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চতুর্থ দিনেই জয় তুলে নিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশের দেওয়া ১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে তাদের লেগেছে ৩৫.১ ওভার। উইকেট হারিয়েছে মোটে ২টি। ফলে ৮ উইকেটের জয়ে ২ ম্যাচ টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
মিরপুর টেস্টে দুই ইনিংসেই ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে দলকে রক্ষা করেছিলেন সাদমান ইসলাম। তার সেঞ্চুরিতেই অন্তত আড়াইশ ছাড়ানো পুঁজি পেয়েছিল স্বাগতিকরা। তবে দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিং যেন সবকিছুকেই ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পুরো ইনিংসে মাত্র একজন ব্যাটার হাফসেঞ্চুরির দেখা পেয়েছিলেন। এই ইনিংসে তো দুই অঙ্কের দেখাই পেয়েছিলেন মোটে ৪ জন ব্যাটার।
এমন বিপর্যয়ের পর বোলারদের খুব বেশি কিছু করার ছিল না। তবুও চেষ্টা করেছিলেন তারা। সেই চেষ্টাও নষ্ট হয়েছে ক্যাচ মিস আর আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে। মাঝে বেরসিক বৃষ্টির হস্তক্ষেপ তো ছিলই। দ্বিতীয় ইনিংসে দুটি ক্যাচ মিস করেছেন বাংলাদেশের ফিল্ডাররা। আর চারবার রিভিউ নিয়েই আম্পায়ার্স কলের কারণে উইকেটের দেখা পায়নি বাংলাদেশ। এর মধ্যে ভারতীয় আম্পায়ার নিতিন মেননের বিপক্ষেই বাংলাদেশের রিভিউ ছিল ৩টি। বাকি একটি ছিল অস্ট্রেলিয়ান আম্পায়ার স্যাম নাগোস্কির বিপক্ষে।
তবে আম্পায়ার্স কল বলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটারদের পারফরম্যান্সকে ছোট করার কোনো সুযোগ নেই। দারুণ ব্যাটিং করেছেন জন ক্যাম্পবেল, ব্র্যান্ডন কিং আর তেজনারায়ণ চন্দ্রপল। দ্বিতীয় সেশনে ওয়ানডে স্টাইলে ব্যাটিং করেছে তারা। ৪.৮৩ ইকোনোমিতে রান তুলেছে তারা।
১৭০ রান তাড়া করতে নেমে শুরুর ওভারটাতেই একটু কষ্ট করতে দেখা গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। বাকি সময়ে সাবলীলভাবে ব্যাটিং করে গেছেন তারা। উদ্বোধনী জুটিতেই ২০.৫ ওভারে ১১২ রান তুলেন ক্যাম্পবেল আর কিং। এসময় বাংলাদেশের কাছে একটি উইকেট যেন ছিল সোনার হরিণের মতো। অবশেষে শরিফুল ইসলাম ভাঙেন এই জুটি। শরিফুলের বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে বোল্ড হয়ে যান ক্যাম্পবেল। এর আগে ৫৫ বলে ৪৯ রান করেন তিনি।
তবে ইনিংসের ১৯তম ওভারে উইকেটের সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। শরিফুলের বলে দ্বিতীয় স্লিপে ক্যাচ তুলে ছিলেন কিং। কিন্তু অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত সেটি মুঠোবন্দি করতে পারেননি। এরপর ৩০তম ওভারে আরেকবার কিংকে জীবন দেন ইবাদত হোসেন। দু’বার জীবন পাওয়া সেই ব্র্যান্ডন কিং-ই বাংলাদেশকে হারিয়েছেন।
দুই ক্যাচ মিসের বাইরে আম্পায়ার্স কলেও ৩বার জীবন পেয়েছেন কিং। সবমিলিয়ে পাঁচটি জীবন পাওয়া কিং অপরাজিত থাকেন ১১৫ বলে ৮১ রান করে। আর ক্যাম্পবেল ফেরার পর তাকে সঙ্গ দিতে নামা কাভিম হজ অপরাজিত থাকেন ২৭ বলে ৩১ রানে। ওয়েস্ট জয় তুলে নেয় অনায়াসেই।
এর বাইরেও কম নাটকীয়তা ছিল না ম্যাচে। বৃষ্টি, বজ্রধ্বনিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ম্যাচের মোমেন্টাম। দুপুর ১২টা ৫৮ মিনিটের দিকে শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। এর ফলে খেলা বন্ধ থাকে প্রায় ৪০ মিনিটের মতো। বৃষ্টি শেষে পূনরায় খেলা শুরু হওয়ার পর আবার বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় বজ্রধ্বনি। এর ফলেও খেলা বন্ধ থাকে প্রায় ৪০ মিনিটের মতো।
এর আগে ৪ উইকেট হাতে রেখে দ্বিতীয় ইনিংসে ৭৯ রান নিয়ে চতুর্থ দিনের শুরু করেছিল বাংলাদেশ। অপরাজিত থেকে মাঠে নেমেছিলেন জাকের আলী অনিক আর নাঈম হাসান। চতুর্থ দিনের সকালটা যে কঠিন হবে সেটি অনুমেয়ই ছিল। একে তো গতকাল থেকে উইকেট থেকে স্পিনাররা সহায়তা পাচ্ছিলেন, তার ওপর সকালের ফ্রেশ উইকেট। এই অবস্থায় উইকেটে টিকে থাকাটাই মূল লক্ষ্য। তবে সেটি পারেননি জাকের। দিনের প্রথম ওভারেই জোমেল ওয়ারিকানের স্লোয়ারে পরাস্ত হয়ে ক্যাচ তুলে দিলেন তিনি। ৩৪ বলে ২২ রানের ইনিংসের সমাপ্তি হলো।
পথ হারানো বাংলাদেশকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ রান এনে দেয় অষ্টম উইকেটে হাসান মাহমুদ ও নাঈম হাসানের জুটি। ৬০ বল খেলে স্কোরবোর্ডে ২৬ রান যোগ করেন তারা। ইনিংসের ৪০তম ওভারের শেষ বলে হাসানকে ফিরিয়ে এই জুটি ভাঙেন ওয়ারিকান। ক্যারিবীয়ান স্পিনারের কুইকার ডেলিভারিতে বলের লাইন মিস করেন হাসান (৩১ বলে ৮)। আম্পায়ার এলবিডব্লিউ আউট দেওয়ার পর রিভিউ নিয়েছিলেন তিনি। তবে সেটি কার্যকর হয়নি।
এরপর নাঈমকে সঙ্গ দিতে ব্যাটিংয়ে নেমে ১৭ রানের আরেকটি জুটি গড়েন তাইজুল ইসলাম। ৩০ বলের এই নবম উইকেট জুটি ভাঙেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক রোস্টন চেজ। তার স্পিনে পরাস্ত হয় এলবিডব্লিউ হন তাইজুল (১৬ বলে ৮)।
শেষ ব্যাটার হিসেবে উইকেটে নামা শরিফুল ইসলামকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন নাঈম। একপ্রান্ত আগলে রেখে হফসেঞ্চুরির কাছে চলে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এরপরই শুরু হয় বৃষ্টি। সকাল ১০টা ৪২ মিনিটের দিকে বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ ঘোষণা করেন আম্পায়াররা।
প্রায় ২০ মিনিট বন্ধ থাকার পর আবারও শুরু হয় ম্যাচ। বিরতি থেকে ফিরেই হাফসেঞ্চুরি তুলে নেন নাঈম। আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্যারিয়ারের এটি তার প্রথম হাফসেঞ্চুরি। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে হাফসেঞ্চুরি করা একমাত্র ব্যাটারও তিনিই। এরপর অবশ্য আর বেশিদূর যেতে পারেননি তিনি। রোস্টন চেজের করা ৪৯তম ওভারের চতুর্থ বলে বাউন্ডারি হাঁকাতে গিয়ে ধরা পড়েন জসুয়া বিশপের হাতে। এর আগে ৯১ বলে ৫২ রান আসে নাঈমের ব্যাট থেকে। বাংলাদেশের ইনিংস থামে ১৪২ রানে।
এর আগে ৪ উইকেট হাতে রেখে ৭৯ রান নিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। ৩২ বলে ১৮ রানে জাকের আর ৩০ বলে ১৮ রানে অপরাজিত থেকে মাঠে নেমেছিলেন নাঈম।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ৯৭.৪ ওভারে ২৭২/১০ (তামিম ৭, মুমিনুল ২৮, শান্ত ১৯, হৃদয় ৪২, সাদমান ১০৫, মিরাজ ১৫, নাঈম ৫, হাসান ৬, তাইজুল ১, শরিফুল০, লিটন ৩৪*; সিলস ১৩-৪-২৯-১, জোসেফ ১৫-৩-৪১-২, রোস্টন ১৩-১-৫৩-০, গ্রেভস ১০-৪-৩০-০, বিশপ ২৩-২-৬১-২, ওয়ারিকান ২৩.৪-৪-৫৩-৫)
ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংস : ৮২.৫ ওভারে ২৪৫/১০ (কিং ১৫, ক্যাম্পবেল ৫৪, হজ ৭, আমির ০, চন্দ্রপল ৫৬, গ্রেভস ৪৬, বিশপ ১৫, জোসেফ ৪, ওয়ারিকান ০, সিলস ০, চেজ ৪৩*; হাসান ১১-১-৩৮-১, শরিফুল ১০-২-২৯-১, মিরাজ ২৫-৫-৬৫-২, তাইজুল ২৬-৩-৭৬-২, নাঈম ১০.৫-১-৩৩-৪)
বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস: ৪৮.৪ ওভারে ১৪২/১০ (তামিম ০, সাদমান ১৩, শান্ত ১০, হৃদয় ০, লিটন ৪, মিরাজ ৯, জাকের ২২, হাসান ৮, তাইজুল ৮, নাঈম ৫২, শরিফুল ৭*; সিলস ৭-১-১৩-০, জোসেফ ৪-১-১৭-১, রোস্টন ১৫.৪-২-৩৬-৪, বিশপ ২-০-১০-০, ওয়ারিকান ২০-৩-৬৩-৪)
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বিতীয় ইনিংস : ৩৫.১ ওভারে ১৭০/২ (ক্যাম্পবেল ৪৯, চন্দ্রপল ১, কিং ৮১*, হজ ৩১*; মিরাজ ৫-০-২৬-০, নাঈম ১১-০-৪৯-০, শরিফুল ৪-০-২০-১, তাইজুল ১২.১-৩-৫৪-০, হাসান ৩-০-১৪-১)
ফলাফল : ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮ উইকেটে জয়ী।
সিরিজ : ২ ম্যাচ সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ
ম্যাচসেরা : জোমেল ওয়ারিকান

ক্রীড়া প্রতিবেদক