পেলের ব্রাজিল নাকি মেসির আর্জেন্টিনা, কোন ফাইনাল সেরা?
চার বছর অপেক্ষার পর বিশ্বকাপ ফাইনাল আসে মাত্র একটি দিনের জন্য, কিন্তু সেই দিনের গল্প বেঁচে থাকে যুগের পর যুগ। কোনো ফাইনাল জন্ম দেয় নতুন কিংবদন্তির, কোনোটি ভেঙে দেয় দীর্ঘদিনের আক্ষেপ, আবার কোনোটি অশ্রু, উল্লাস ও নাটকীয়তার অনন্য মিশেলে ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে যায়। প্রায় এক শতাব্দীর বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমনই স্মরণীয় সব লড়াইয়ের মধ্য থেকে সর্বকালের সেরা ১০টি ফাইনালের তালিকা প্রকাশ করেছে বিবিসি স্পোর্ট।
নাটকীয়তা, ম্যাচের মান, তারকাদের পারফরম্যান্স এবং ইতিহাসে রেখে যাওয়া প্রভাব বিবেচনায় তৈরি সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ১৯৭০ সালে ইতালিকে হারিয়ে ব্রাজিলের বিশ্বজয়। আর দ্বিতীয় স্থানে জায়গা পেয়েছে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার ২০২২ সালের অবিস্মরণীয় শিরোপা জয়।
তালিকার শীর্ষে থাকা ১৯৭০ সালের ফাইনালকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দলীয় পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মেক্সিকোর অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে ইতালিকে ৪–১ গোলে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। পেলে, জাইরজিনহো, তোস্তাও, রিভেলিনো ও কার্লোস আলবার্তোদের নিয়ে গড়া সেই দল আজও নান্দনিক ফুটবলের শ্রেষ্ঠ প্রতীক। বিশেষ করে কার্লোস আলবার্তোর দুর্দান্ত দলগত গোলটি বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা গোলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের রুদ্ধশ্বাস ফাইনাল। লিওনেল মেসির জোড়া গোল, কিলিয়ান এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক এবং টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার ৪–২ ব্যবধানের জয় ম্যাচটিকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাইনালে পরিণত করেছে। এই শিরোপার মধ্য দিয়েই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেন মেসি।
তৃতীয় স্থানে রয়েছে ১৯৬৬ সালের ফাইনাল, যেখানে অতিরিক্ত সময়ে পশ্চিম জার্মানিকে ৪–২ গোলে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ জেতে ইংল্যান্ড। স্যার জিওফ হার্স্টের হ্যাটট্রিক আজও বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে অনন্য কীর্তি।
চতুর্থ স্থানে রয়েছে ১৯৫৮ সালের ফাইনাল, যেখানে মাত্র ১৭ বছর বয়সে জোড়া গোল করে সুইডেনকে ৫–২ ব্যবধানে হারিয়ে ব্রাজিলকে প্রথম বিশ্বকাপ জেতান পেলে। পঞ্চম স্থানে রয়েছে ১৯৯৮ সালের ফাইনাল। জিনেদিন জিদানের জোড়া গোলে স্বাগতিক ফ্রান্স ব্রাজিলকে ৩–০ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরে।
ষষ্ঠ স্থানে জায়গা পেয়েছে ১৯৮৬ সালের ফাইনাল। ডিয়েগো ম্যারাডোনার অনবদ্য পাস থেকে হোর্হে বুরুচাগার জয়সূচক গোলে পশ্চিম জার্মানিকে ৩–২ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। সপ্তম স্থানে রয়েছে ১৯৫৪ সালের 'মিরাকল অব বার্ন', যেখানে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও পশ্চিম জার্মানি শক্তিশালী হাঙ্গেরিকে ৩–২ গোলে হারিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছিল।
অষ্টম স্থানে রয়েছে ১৯৭৪ সালের ফাইনাল। ইয়োহান ক্রুইফের দুর্দান্ত নেদারল্যান্ডসকে ২–১ গোলে হারিয়ে স্বাগতিক পশ্চিম জার্মানি শিরোপা জেতে। নবম স্থানে জায়গা পেয়েছে ২০০৬ সালের ইতালি–ফ্রান্স ফাইনাল, যেখানে জিনেদিন জিদানের বিতর্কিত হেডবাট, লাল কার্ড এবং শেষ পর্যন্ত ইতালির টাইব্রেকারে জয় ম্যাচটিকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ফাইনালে পরিণত করেছে।
তালিকার দশম স্থানে রয়েছে ২০০২ সালের ফাইনাল। রোনালদোর জোড়া গোলে জার্মানিকে ২–০ ব্যবধানে হারিয়ে পঞ্চম বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল। ১৯৯৮ সালের হতাশা ও দীর্ঘ চোট কাটিয়ে রোনালদোর সেই প্রত্যাবর্তন আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায় হিসেবে স্মরণ করা হয়।
শেষ বাঁশি বাজলে একটি ফাইনাল শেষ হয়। কিন্তু তার গল্প তখনই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় প্রজন্ম, পাল্টে যায় ফুটবলের রূপ, তবু এসব ম্যাচের আবেদন একটুও ফিকে হয় না। কারণ বিশ্বকাপের সেরা এই ফাইনালগুলো শুধু শিরোপা নির্ধারণ করেনি। ফুটবলকে উপহার দিয়েছে এমন সব মুহূর্ত, যা যুগের পর যুগ আবেগ, গৌরব আর বিস্ময়ের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।

স্পোর্টস ডেস্ক