রিয়ালের ভিনিসিয়াসকে কি ফিরে পেয়েছে ব্রাজিল?
ক্লাবে যতটা উজ্জ্বল, জাতীয় দলে ঠিক ততটাই বিবর্ণ— কিছুদিন আগেও এমন কথা নিয়মিত শুনতে হতো ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে। এমন ধারণা অমূলকও ছিল না। নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ঘিরে তৈরি হওয়া সেই ধারণা অবশেষে পাল্টে দিতে শুরু করেছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। এখন জাতীয় দলের জার্সিতেও সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড।
রিয়াল মাদ্রিদে গত কয়েক মৌসুমে নিজেকে ক্লাবের অন্যতম নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত করেছেন ভিনিসিয়াস। ইতোমধ্যে তিনি ক্লাব ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোল করা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার। রোনালদো নাজারিওকে ছাড়িয়ে এই কীর্তি গড়েছেন তিনি। মাত্র সাত মৌসুমেই ২০০ ম্যাচ জয়ের মাইলফলক স্পর্শ করা ভিনিসিয়াস পরে ৩৫০ ম্যাচও পূর্ণ করেন রিয়ালের জার্সিতে। এই সময়ে জিতেছেন ১৪টি শিরোপা, যার মধ্যে রয়েছে দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও তিনটি লা লিগা শিরোপা। ২০২৪ সালে জিতেছেন ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড় ‘দ্য বেস্ট’ পুরস্কারও।
এসব অর্জনই বলে দেয়, সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে তিনি এখন শুধুই একজন তারকা নন, ক্লাব ইতিহাসের অন্যতম সফল ব্রাজিলিয়ানদের একজন।
চলতি বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফর্মে ফিরে ভিনিসিয়াস অবশেষে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে ব্রাজিলকে গ্রুপ পর্ব পার করিয়েছেন।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ভিনিসিয়াস বলেছিলেন, যদি বিশ্বকাপে গিয়ে চার-পাঁচটা গোল করি এবং আমরা চ্যাম্পিয়ন হই, তাহলে পুরো গল্পটাই পাল্টে যাবে। তখন লোকে বলবে, আমি তো শুরু থেকেই বিশ্বকাপের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এমনকি যে ম্যাচগুলোতে ভালো খেলিনি, সেগুলোতেও।
উত্তর আমেরিকার আসরে সেই কথাই যেন সত্যি করে দেখাচ্ছেন তিনি। তিন ম্যাচেই করেছেন চার গোল।
আসরে বড় বড় তারকা যখন পালাক্রমে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছেন, ভিনিসিয়াসও তখন হতাশ করেননি। গোল্ডেন বুটের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে তিনি আছেন ভালোভাবেই। চার গোল নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ কিলিয়ান এমবাপে, ব্যালন ডি’অর জয়ী উসমান দেম্বেলে ও আর্লিং হলান্ডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছেন। ছয় গোল নিয়ে শীর্ষে থাকা লিওনেল মেসির ঠিক পরেই অবস্থান তার।
মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করে বিশ্বকাপে হতাশাজনক সূচনা করলেও, ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় ভিনিসিয়াসের মুহূর্তের ঝলকই হার থেকে বাঁচায় ব্রাজিলকে। ব্রুনো গিমারেসের পাস ধরে ডি বক্সে বাঁ দিকে কাট করে একজনকে এড়িয়ে দুর্দান্ত শটে দূরের পোস্ট ঘেঁষে বল জালে জড়ান তিনি।
হাইতির বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়ে মাতেউস কুইয়ার গোলে অ্যাসিস্ট করার পর নিজেও করেন দলের তৃতীয় গোল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে তো ছিলেন আরও বিধ্বংসী। প্রতিপক্ষের দুটি ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে করেন জোড়া গোল। আরও একবার বল জালে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ভিএআরে ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল হয়। নইলে হয়ে যেতে পারত হ্যাটট্রিকও। যে কীর্তি ১৯৫৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে পেলের পর আর কোনো ব্রাজিলিয়ানের হয়নি।
বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই গোল করা ব্রাজিলের পঞ্চম ফুটবলার তিনি। আগের চারজনের ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিল। ১৯৭০ সালে জাইরজিনিয়ো, ১৯৯৪ সালে রোমারিও এবং ২০০২ সালে রোনালদো ও রিভালদো সেই তালিকায় আছেন। ভিনিসিয়াসের এই কীর্তিকে তাই শুভ লক্ষণ হিসেবেই দেখছেন অনেকেই।
২০১৪ সালে ঘরের মাঠে নেইমারের পর এক বিশ্বকাপে চার গোল করা প্রথম ব্রাজিলিয়ানও ভিনিসিউস। স্কটল্যান্ড ম্যাচ দিয়ে প্রায় তিন বছর পর জাতীয় দলে ফেরা নেইমারও ম্যাচ শেষে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন তাকে।
‘ভিনি জুনিয়র আমাদের তারকা খেলোয়াড়। সে অসাধারণ ফর্মে আছে, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে।’
এবারের বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে ভিনিসিউসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য যুগান্তকারী মুহূর্ত। বিশ্বকাপ শুরুর আগে প্রায় অর্ধশত আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার গোল ছিল মাত্র ৯টি, অ্যাসিস্টও ৯টি। কাতার বিশ্বকাপে করেছিলেন একটি গোল, ২০২৪ কোপা আমেরিকায় করেছিলেন দুটি। বাকি গোলগুলো এসেছিল প্রীতি ম্যাচে।
ভিনিসিয়াস নিজেও স্বীকার করেছেন, ব্রাজিলের হয়ে তার আগের পারফরম্যান্স রিয়াল মাদ্রিদের মানের ধারেকাছেও ছিল না। এখন সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের ঘুরে দাঁড়ানোর মুহূর্তটি তিনি উপভোগ করছেন।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর তিনি বলেন, জাতীয় দলের হয়ে এমন সময়ও গেছে, যখন আমার ফুটবল প্রতিভা দেখাতে পারিনি। আর এমন পরিস্থিতিতে অনেক গোল করা ও দারুণ পারফর্ম করার চেয়ে ভালো কিছু নেই। রিয়াল মাদ্রিদে করা পরিশ্রমের কারণেই আমি বিশ্বাস করতাম, সঠিক সময়েই ব্রাজিলের জার্সিতে আবার জ্বলে উঠব।
ভিনিসিয়াস ঠিকই জ্বলে উঠেছেন। ক্লাবের পর এখন জাতীয় দলেরও সবচেয়ে বড় নির্ভরতার নাম তিনি। রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে শেষ পর্যন্ত কতদূর টেনে নিতে পারেন, সেটিই এখন দেখার।
নকআউট পর্বের শুরুতে জাপানের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। গত অক্টোবরে প্রীতি ম্যাচে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে হেরেছিল আনচেলত্তির দল। এবার সেই হিসাব চুকানোর মঞ্চে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা ভিনিসিয়াস জুনিয়র।

স্পোর্টস ডেস্ক