ট্রফির খোঁজে লুকাকু-ডি ব্রুইনাদের শেষ অভিযান
কাতার বিশ্বকাপের সেই মরুঝড়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার দুঃসহ স্মৃতি এখনো বেলজিয়াম ফুটবলের আকাশে কালো মেঘের মতো জমে আছে। তবে অতীতকে পেছনে ফেলে, পশ্চিম ইউরোপের পরাশক্তি বেলজিয়াম এবার নতুন কোচের হাত ধরে পা রাখছে উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে।
২০১৮ সালে রাশিয়ার সেই ঐতিহাসিক তৃতীয় স্থান পাওয়ার গৌরবকে ফিরিয়ে আনা এবং কাতার ট্র্যাজেডির ক্ষত মোচন করাই এখন এই দলের প্রধান লক্ষ্য। কেভিন ডি ব্রুইনা আর রোমেলু লুকাকুদের সোনালি প্রজন্মের সম্ভবত এটাই শেষ বিশ্বকাপ। আর তাই এবার তারা মাঠে নামবে নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিতে।
ডাগআউটের নতুন মাস্টারমাইন্ড রুডি গার্সিয়া
২০১৮ বিশ্বকাপের সেই অগ্নিঝড়া পারফরম্যান্সের পর মুদ্রার উল্টোপিঠও দেখে বেলজিয়াম। দল যখন একের পর এক পরাজয় আর অস্থিরতায় ভুগছিল, ঠিক তখনই ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেলজিয়ামের ডাগআউটের দায়িত্ব নেন অভিজ্ঞ ফরাসি ট্যাকটিশিয়ান রুডি গার্সিয়া। দায়িত্ব নিয়েই উয়েফা নেশনস লিগের বাঁচা-মরার প্লে-অফে ইউক্রেনকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে দলের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনেন তিনি।
ক্লাব ফুটবলে লিলিকে ঐতিহাসিক ‘ডাবল’ জেতানো কিংবা রোমা ও মার্সেইয়ের মতো নামী ক্লাবের দায়িত্ব সামলানো গার্সিয়া এবার বেলজিয়ামকে এনে দিয়েছেন বিশ্বকাপের টিকিট।
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে অপ্রতিরোধ্য বেলজিয়াম
ইউরোপিয়ান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ‘জে’ গ্রুপে ছিল বেলজিয়াম। বাছাইপর্বে অপ্রতিরোধ্য ছিল ডি- ব্রুইনা-রোমেলু লুকাকুরা। কোচ রুডি গার্সিয়ার অধীনে খেলা আট ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিতে জয় এবং তিনটিতে ড্র করেছিল তারা। ‘জে’ গ্রুপের শীর্ষে থেকেই বিশ্বকাপের টিকিট কাটে তারা।
২০২৬ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের ম্যাচ সূচি
ইউরোপীয় ঘরানার বাইরে এবার বেলজিয়ামকে লড়তে হবে আফ্রিকা, এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের ভিন্ন ঘরানার ফুটবলের বিপক্ষে। ১৫ জুন সিয়াটল স্টেডিয়ামে তাদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু হবে আফ্রিকার দেশ মিশরের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। ২১ জুন লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ম্যাচে বেলজিয়ামের প্রতিপক্ষ এশিয়ার দেশ ইরান। ২৬ জুন ভ্যানকুভারের বিসি প্লেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলবে তারা।
পজিশনভিত্তিক স্কোয়াডের গভীরতা
অভিজ্ঞতার পাহাড় আর তারুণ্যের ক্ষিপ্রতা—এই দুইয়ের মিশেলে ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন রুডি গার্সিয়া। যেখানে গোলবারের নিচে কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই প্রথম পছন্দ রিয়াল মাদ্রিদের বিশ্বসেরা প্রাচীর থিবো কোর্তোয়া। ২০১৮ বিশ্বকাপের সেরা এই গোলরক্ষকই থাকবেন দলের মূল ভরসা।
থমাস মুনিয়েরের মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারের পাশাপাশি একঝাঁক তরুণ ও গতিশীল ফুটবলার দিয়ে রক্ষণভাগ সাজিয়েছেন গার্সিয়া, যা আধুনিক ফুটবলের কাউন্টার অ্যাটাক রুখতে বেশ কার্যকর।
মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি অধিনায়ক কেভিন ডি ব্রুইনা। তার নিখুঁত পাসিং আর দূরদর্শিতা বিশ্বের যেকোনো ডিফেন্সের জন্য আতঙ্ক। আক্রমণভাগে গতি তারকা জেরেমি ডকুর ক্ষিপ্রতা এবং দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা রোমেলু লুকাকুর ফিজিক্যাল ফুটবল প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। চমক হিসেবে দলে সুযোগ পেয়েছেন তরুণ পার্দো।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
বড় ম্যাচে দুই বিশ্বসেরা তারকা লুকাকু-ডি ব্রুইনা জুটির রসায়ন যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। এর সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষকের উপস্থিতি রক্ষণভাগকে আলগা সাহস জোগাবে।
কিছু শঙ্কার জায়গাও অবশ্য রয়েছে। মাঝমাঠের প্রধান তারকাদের বয়স এখন ত্রিশের কোঠায়, ফলে টুর্নামেন্টের দীর্ঘ ও হাই-ইনটেনসিটি ম্যাচে ফিটনেস ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে তাদের জন্য।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক
১৯৩০ সালের উদ্বোধনী বিশ্বকাপেই বিশ্বমঞ্চে পা রেখেছিল বেলজিয়াম। তবে তাদের ফুটবল ইতিহাসের সোনালি সাফল্য আসে ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোর মাটিতে চতুর্থ স্থান অর্জন এবং পরবর্তীতে ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ব্রোঞ্জ পদক বা তৃতীয় স্থান লাভ করার মাধ্যমে।
স্মরণীয় যত রেকর্ড
সর্বোচ্চ গোলদাতা : বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের হয়ে যৌথভাবে সর্বোচ্চ পাঁচটি করে গোল করেছেন সাবেক তারকা মার্ক উইলমোটস এবং বর্তমান স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু। এবারের আসরে একটি গোল করলেই লুকাকু এককভাবে চলে যাবেন শীর্ষে।
মাঝমাঠের জাদুকর এনজো শিফো : ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে টানা চারটি বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১৭টি ম্যাচ খেলার অনন্য রেকর্ডের মালিক কিংবদন্তি এনজো শিফো।
সবচেয়ে বড় জয় : বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় ব্যবধানের জয় তিনটি। ১৯৭০ সালে এল সালভাদরের বিপক্ষে ৩–০, ২০১৮ সালে পানামার বিপক্ষে ৩–০ এবং তিউনিসিয়ার বিপক্ষে ৫–২ ব্যবধানের জয়।
২০২৬ বিশ্বকাপে লক্ষ্য
রবার্তো মার্টিনেজের অধ্যায়ের পর রুডি গার্সিয়া যেভাবে দলটিকে গুছিয়ে এনেছেন, তাতে রেড ডেভিলস ভক্তরা আবারও বড় স্বপ্নের জাল বুনতেই পারেন। ডি ব্রুইনা-লুকাকুদের ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে এসে বেলজিয়ামের লক্ষ্য থাকবে ২০১৮ বিশ্বকাপের স্মৃতি ফিরিয়ে আনা কিংবা তারও বেশি কিছু করে ইতিহাস গড়া।
বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলরক্ষক : থিবো কোর্তোয়া, সেন লামেন্স, মাইক পেন্ডার্স।
ডিফেন্ডার : টিমোথি কস্তানে, জেনো ডেবাস্ট, ম্যাকসিম ডি কুইপার, কোনি ডি উইন্টার, ব্র্যান্ডন মেখেলে, থমাস মুনিয়ে, নাথান এনগয়, হোয়াকিন সাইস, আর্থার থিয়াতে।
মিডফিল্ডার : কেভিন ডি ব্রুইনা, আমাদু ওনানা, নিকোলাস রাসকিন, ইউরি তিলেমান্স, হান্স ভানাকেন, অ্যাক্সেল ভিতসেল।
ফরোয়ার্ড : চার্লস ডি কেতেলায়েরে, জেরেমি ডকু, মাতিয়াস ফার্নান্দেজ-পার্দো, রোমেলু লুকাকু, ডোদি লুকেবাকিও, দিয়েগো মোরেইরা, আলেক্সিস সালেমেকার্স, লিয়েন্দ্রো ট্রোসার্ড।

ক্রীড়া প্রতিবেদক