বিশ্বমঞ্চে তুর্কি ফুটবলের এক নতুন ভোরের প্রত্যাশা
কসোভোর বিপক্ষে প্লে-অফ ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো তুরস্ক জুড়ে যেন আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিশ্বমঞ্চে ফিরছে ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম লড়াকু এই দলটি। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব নেওয়া ইতালীয় মাস্টারমাইন্ড ভিঞ্চেন্তসো মোন্তেল্লার হাত ধরে দীর্ঘ খরা কাটিয়ে অবশেষে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এর মূল পর্বে পা রাখতে যাচ্ছে তুরস্ক।
উত্তর আমেরিকার এই আসরটি হতে যাচ্ছে বিশ্বমঞ্চে তুর্কিদের তৃতীয়বারের মতো অংশগ্রহণ। তবে ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলে তৃতীয় স্থান অর্জন করা ‘ক্রেসেন্ট স্টার’রা এবার কেবল অংশ নিতে নয়, বরং আরদা গুলার ও কেনান ইলদিজের মতো উদীয়মান তরুণদের নিয়ে নতুন এক রূপকথা লিখতে উত্তর আমেরিকার বিমান ধরছে।
ডাগআউটের ইতালীয় মাস্টারমাইন্ড ভিঞ্চেন্তসো মোন্তেল্লা
খেলোয়াড়ি জীবনে সিরি-এ লিগের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ও রোমার হয়ে ‘স্কুদেত্তো’ জেতা ভিঞ্চেন্তসো মোন্তেল্লা তুরস্কের কোচ হওয়া চতুর্থ ইতালীয় নাগরিক। এসি মিলান, ফিওরেন্তিনা ও সেভিয়ার ডাগআউট সামলানোর পর তুরস্কের ক্লাব আদানা দেমিরস্পরে কোচিং করিয়ে তুর্কি ফুটবলের হৃদস্পদন চিনেছিলেন তিনি।
স্তেফান কুন্টসের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে মোন্তেল্লা তুর্কি ফুটবল ও সমর্থকদের সঙ্গে দারুণভাবে মিশে গেছেন। তার নিজের ভাষ্যমতে, ‘আমি এখন একজন তুর্কির মতোই অনুভব করি এবং তুর্কিদের মতোই চিন্তা করি।’
বাছাইপর্বের রোমাঞ্চ
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কঠিন গ্রুপে ছিল তুরস্ক। যেখানে তাদের লড়তে হয়েছে স্পেনের মতো দলের সঙ্গে। সেই দলের পেছনে থেকে দ্বিতীয় স্থানে (৪ জয়, ১ ড্র, ১ হার) মিশন শেষ করার পর প্লে-অফের কঠিন মঞ্চে নিজের ট্যাকটিক্যাল ম্যাজিক দেখান দলটির কোচ মোন্তেল্লা। রোমানিয়া ও কসোভোর বিরুদ্ধে স্নায়ুক্ষয়ী ১-০ ব্যবধানের দুটি মাস্টারক্লাস জয় তুলে নিয়ে তিনি তুরস্কের টিকিট নিশ্চিত করেন।
বিশ্বকাপে তুরস্কের ম্যাচ সূচি
বিশ্বকাপের মঞ্চে গ্রুপ পর্বে তুরস্ককে লড়কে হবে এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং স্বাগতিক শক্তির বিপক্ষে। ১৩ জুন ভ্যানকুভারে এশিয়ান পরাশক্তিদের একটি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে তুরস্ক। ১৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো স্টেডিয়ামে খেলবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ের বিপক্ষে। ২৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তুর্কিদের প্রতিপক্ষ স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র।
পজিশনভিত্তিক স্কোয়াড অ্যানালাইসিস
কোচ মোন্তেল্লা প্রতিভায় ঠাসা ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন। যেখানে তারুণ্য ও লা লিগার অভিজ্ঞতার এক দারুণ মেলবন্ধন রয়েছে।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের আলতাই বাইন্দির এবং অভিজ্ঞ মের্ত গুনোকের উপস্থিতিতে তুরস্কের গোলপোস্ট বেশ নিরাপদ। গোলকিপিং পজিশনে এই সুস্থ প্রতিযোগিতা দলের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। তবে, প্রথম পছন্দ হিসেবে হয়ত বাইন্দিরের ওপরই ভরসা রাখবেন কোচ।
চাগলার সোয়ুনচু এবং মেরিহ দেমিরালের মতো অভিজ্ঞ ও ফিজিক্যাল সেন্টার-ব্যাকরা যেকোনো আক্রমণভাগের জন্য কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন। এর সঙ্গে উইং-ব্যাকে ব্রাইটন তারকা ফেরদি কাদিওগলুর গতি ও ওভারল্যাপ করার ক্ষমতা দলের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
ইন্টার মিলানের মাঝমাঠের জাদুকর ও অধিনায়ক হাকান চালহানোগলু এই দলের মস্তিষ্কের মতো কাজ করবেন। তার দূরপাল্লার বুলেট শট, সেট-পিস দক্ষতা এবং ইন্টার মিলানের হয়ে সিরি-এ জেতার অভিজ্ঞতা মাঝমাঠকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। বেনফিকার অরকুন ককচু তার সঙ্গে ক্রিয়েটিভ পার্টনার হিসেবে থাকবেন।
তুরষ্কের আক্রমণভাগ ইউরোপের দলগুলোর মধ্যে বেশ শক্তিশালী একটি। রিয়াল মাদ্রিদের বিস্ময়বালক আরদা গুলার এবং জুভেন্টাসের কেনান ইলদিজের জাদুকরী ড্রিবলিং ও ক্রিয়েটিভিটি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। সঙ্গে গ্যালাতাসারাইয়ের বারিশ আলপার ইলমাজ এবং বেনফিকার কেরেম আকতুরকোগলুর ফর্ম আক্রমণভাগকে গতিময় ও বিধ্বংসী করে তুলবে।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাসের দুই তরুণ তুর্কির যেকোনো মুহূর্ত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে। সেই সঙ্গে হাকান চালহানোগলুর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দলের মূল শক্তি। এছাড়াও উইং এবং সেন্ট্রাল পজিশনে গতিময় ও টেকনিক্যালি দক্ষ একাধিক খেলোয়াড় থাকায় মোন্তেল্লা সহজেই প্রতিপক্ষ অনুযায়ী কৌশল বদলাতে পারেন।
তবে এই স্কোয়াডে কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। বাছাইপর্বের ৬ ম্যাচে ১৭টি গোল করলেও তুর্কিরা হজম করেছিল ১২টি গোল। যার মধ্যে স্পেনের কাছে ৬-০ গোলে হারের ম্যাচও রয়েছে। বড় দলগুলোর হাই-প্রেসের সামনে ডিফেন্সের এই খেই হারিয়ে ফেলার প্রবণতা বেশ চিন্তার কারণ হবে তুরস্কের জন্য।
এছাড়া বর্তমান স্কোয়াডের কারোরই বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টে খেলার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, যা নকআউট পর্বের স্নায়ুচাপের মুখে দলটির বড় পরীক্ষা নেবে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক
তুরস্কের বিশ্বকাপ ইতিহাস সব সময়ই চরম নাটকীয়তায় ভরা। ১৯৫০ বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করেও তারা নাম প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর ১৯৫৪ সালে তাদের অভিষেক হয় প্লে-অফে স্পেনের সঙ্গে ড্র করার পর স্টেডিয়ামের এক কর্মচারীর ১৪ বছর বয়সী ছেলের লটারির মাধ্যমে ‘তুরস্ক’ নাম তোলার নাটকীয় ভাগ্যের জোরে! সেবার দক্ষিণ কোরিয়াকে তারা ৭-০ গোলে হারিয়েছিল।
স্মরণীয় যত রেকর্ড
সর্বোচ্চ গোলদাতা : সুয়াত মামাত, বুরহান সারগুন (১৯৫৪) এবং ইলহান মানসিজ (২০০২)— এদের প্রত্যেকেরই বিশ্বকাপের মঞ্চে ৩টি করে গোল রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ম্যাচ : ২০০২ সালের সেই সোনালী প্রজন্মের হাকান শুকুর, রুস্তু রেকবের ও মানসিজসহ মোট ৭ জন খেলোয়াড় দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ৭টি করে ম্যাচ খেলেছেন। এবারের আসরে সেমিফাইনালে যেতে পারলে এই রেকর্ড ভাঙার সুযোগ থাকবে গুলারদের সামনে।
বিশ্বকাপের দ্রুততম গোল : ২০০২ সালের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর মাত্র ১১ সেকেন্ডের মাথায় গোল করেন হাকান শুকুর। যা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্রুততম গোলের রেকর্ড।
সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত : ২০০২ বিশ্বকাপে সেনেগালের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ইলহান মানসিজের সেই ঐতিহাসিক 'গোল্ডেন গোল', যা তুরস্ককে সেমিফাইনালের টিকিট এনে দিয়েছিল।
২০২৬ বিশ্বকাপে লক্ষ্য
ভিঞ্চেন্তসো মোন্তেল্লার এই ‘নতুন তুরস্ক’ দেশটির ফুটবলপ্রেমী জন্য এক দারুণ উপহার। আরদা গুলারের বাঁ পায়ের শৈল্পিক জাদু আর চালহানোগলুর অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার মাটিতে ২৪ বছরের ক্ষোভ মেটাতে নামবে তুর্কিরা।
তুরস্কের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলরক্ষক : আলতাই বাইন্দির, মের্ত গুনোক, উগুরজান চাকির।
ডিফেন্ডার : আবদুলকেরিম বারদাকচি, চাগলার সোয়ুনচু, এরেন এলমালি, ফেরদি কাদিওগলু, মেরিহ দেমিরাল, মের্ত মুলদুর, ওজান কাবাক, সামেত আকায়দিন, জেকি চেলিক।
মিডফিল্ডার : হাকান চালহানোগলু, ইসমাইল ইউকসেক, কান আইহান, অরকুন ককচু, সালিহ ওজচান।
ফরোয়ার্ড : আরদা গুলার, বারিশ আলপার ইলমাজ, জান উজুন, দেনিজ গুল, ইরফান জান কাহভেজি, কেনান ইলদিজ, কেরেম আকতুরকোগলু, ওগুজ আইদিন, ইউনুস আকগুন।

ক্রীড়া প্রতিবেদক