তেঁতুলিয়া নদী : আশার নদী আজ সর্বনাশা
মেঘনার কোল ঘেঁষে ভোলা ও পটুয়াখালীর বুক চিরে বঙ্গোপসাগরে মিশে যাওয়া তেঁতুলিয়া নদী একসময় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে ছিল ভরসা ও সম্ভাবনার প্রতীক।
মধ্যযুগীয় মুঘল ও ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এই নদীর বদৌলতেই গড়ে উঠেছিল কালাইয়ার মতো বানিজ্যিক বন্দর এবং অসংখ্য জনপদ। ভোলা-পটুয়াখালীর মানুষের চলাচলের প্রধান নৌপথ এবং লক্ষাধিক জেলের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ছিল এই তেঁতুলিয়া। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই তেঁতুলিয়াই আজ রূপ নিয়েছে এক ভয়াল থাবায়-যা কেড়ে নিচ্ছে হাজারো মানুষের শেষ সম্বল।
ভাঙনের কবলে নিঃস্ব জনপদ
পটুয়াখালীর বাউফল ও দশমিনা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গত এক দশকে তেঁতুলিয়ার করাল গ্রাসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে হাজার হাজার একর জমি ও ঘরবাড়ি। দশমিনার হাজিরহাট, হাজিকান্দা ও কেদির হাট এলাকা এবং বাউফলের চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চরব্যারেটসহ বিভিন্ন স্থানে নদীর তান্ডব চলছে অবিরাম। নদী পাড়ের জেলে নিজাম উদ্দিন মৃধা কিংবা ৭ বার ভাঙনের শিকার কহিনুর বেগমের মতো শত শত মানুষের জীবন আজ ছিন্নভিন্ন। বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারিয়ে কেউ এখন পটুয়াখালীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ঘরে, আবার কেউ খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
মানবসৃষ্ট সংকট ও বালুখেকোদের মহোৎসব
প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপ পরিবর্তনের পাশাপাশি এই ভয়াবহতার পেছনে রয়েছে প্রবল মানবসৃষ্ট সংকট। নদীর ধুলিয়া লঞ্চঘাট, চরব্যারেট, চন্দ্রদ্বীপ খেয়াঘাট ও হাজিরহাট পয়েন্ট থেকে অবাধে বালু উত্তোলনে মেতে উঠেছে প্রভাবশালী একটি চক্র। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. তারিকুল ইসলাম সজিবের মতে, জলবায়ুর তীব্র ওঠানামা এবং অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন নদী ভাঙনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মাছের আকাল ও মৎস্যজীবীদের সংকট
ভাঙনের পাশাপাশি তেঁতুলিয়ায় দেখা দিয়েছে মাছের মারাত্মক সংকট। বিশেষ করে প্রধান ইলিশ অভয়াশ্রমে মাছের আকাল দুই লক্ষাধিক জেলে পরিবারকে চরম বিপাকে ফেলেছে। ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাজিব সরকার জানান, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের পাশাপাশি প্রজনন মৌসুমে অসাধু চক্রের বেহুন্দি জাল দিয়ে মা ইলিশ ও জাটকা নিধনের মহোৎসবই এই সংকটের প্রধান কারণ।
বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালী জেলার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। নদী পাড়ের অবহেলিত মানুষের দাবি-অবিলম্বে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধ করা হোক, নদী পানিপ্রবাহ সমীক্ষা করে বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নেওয়া হোক এবং ইলিশের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা হোক। জনপ্রতিনিধিদের মৌখিক আশ্বাসের দিন শেষ, এখন প্রয়োজন তেঁতুলিয়া রক্ষায় বাস্তবমুখী ও টেকসই উদ্যোগ।
লেখক : পটুয়াখালী (বাউফল-দুমকি), এনটিভি অনলাইন প্রতিনিধি

এম.এ হান্নান, পটুয়াখালী (বাউফল-দুমকি)