ইসলামাবাদ বৈঠক
যুদ্ধ কি চলবেই?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধর পর ভার্সায় চুক্তি, আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মিউনিখ। এগুলো শান্তির উদ্দেশে হলেও এর মধ্যেই বপিত বিশ্বের কালো কিছু অধ্যায়ের বীজ। আর এবার পাকিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে শান্তি চুক্তির আশা করা হয়েছে, সেটিও কতদূর ফলপ্রসু হবে, তা নিয়ে ছিল শঙ্কা। কারণ, যে যুদ্ধ বেঁধেছিল ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে, যেখানে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে ইরানকে বিধ্বস্ত করতে উঠেপড়ে লেগেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন, সেই যুদ্ধের বিরতি ও পরবর্তী ভাগ্য নির্ধারণে ইসরায়েলকে বাদ রেখেই পাকিস্তানের আহ্বানে সে দেশটিতে আলোচনার টেবিলে আলাদাভাবে বসেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। যা অনেকটাই মিউনিখ চুক্তির প্রতিচ্ছবি বলে মনে করা হচ্ছে। সে সময়ে চেকোস্লোভাকিয়াকে বাদ রেখেই চলেছিলো আলোচনা, এবার ইসরায়েলকে বাদ রেখে। যদিও সে-বার চুক্তিতে পৌঁছেছিল যুদ্ধবাজ জার্মান নেতা হিটলার, কিন্তু এবার দীর্ঘ বৈঠকের পর চুক্তি না করেই পাকিস্তানের ইসলামাবাদ ছেড়ে ওয়াশিংটনের পথে রওয়ানা হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স। তাহলে কী হতে চলেছে বিশ্ব পরিস্থিতি, যুদ্ধ কি চলবেই—প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে দেশ থেকে দেশে; জনসাধারণের মনে, মস্তিষ্কে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি
আমরা এখন যে বিশ্ব পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, সেটি এক কথায় অনিশ্চয়তায় ভরা। যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু শেষ হয়নি। আলোচনা চলছে, কিন্তু সমাধান আসেনি। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে ঘিরে যে সংঘাত তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে স্থির হয়ে আছে। এই স্থিরতা আসলে ঝড়ের আগের নীরবতা কিনা, সেই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠছে।
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরাসরি আলোচনা নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক ঘটনা। কারণ বহু বছর পর দুই দেশ সরাসরি এক টেবিলে বসেছে। তবে, এই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ ‘ইসরায়েল’ অনুপস্থিত। আর এই অনুপস্থিতিই পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
কেন জটিল?
ইতিহাস বলছে, যখন কোনো সংঘাতে সরাসরি জড়িত পক্ষকে বাদ রেখে আলোচনা হয়, তখন সেই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মিউনিখ চুক্তিতে চেকোস্লোভাকিয়াকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ফলাফল আমরা সবাই জানি, একটি বড় যুদ্ধের ঝড় থামেনি, বরং আরও বড় আকারে ফিরে এসেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো কালো একটি অধ্যয়কে আজও ধারণ করে আসছে পৃথিবী। এখানেও এমনটা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, ইসরায়েলকে বাদ দিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলেও সেটি হয়তো পূর্ণাঙ্গ শান্তি আনতে পারবে না। বরং, এটি ভবিষ্যতের সংঘাতের বীজ বপন করতে পারে। কারণ, গতবার ছিল চেক ভুখণ্ড আর এবার হরমুজ প্রণালী। হরমুজ প্রণালীকে ইরান যেমন তাদের বাইরে কখনোই মেনে নেবে না, সেখানে কারও কর্তৃত্ব মেনে নেবে না, তেমনই যুক্তরাষ্ট্রও বুঝে গিয়েছে, এই প্রণালী কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এবং তারা সেদিকেই নজর দিচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ইস্যু ও বিশ্ব
বর্তমানে সবচেয়ে বড় যে ইস্যুটি সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটি হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালিটি শুধু একটি জলপথ নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি লাইফলাইন। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। অর্থাৎ, এই প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ধাক্কা খাবে। তেলের দাম বাড়বে, জ্বালানি সংকট তৈরি হবে, এবং তার প্রভাব সরাসরি পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে। ইরান এই প্রণালিকে তাদের কৌশলগত শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা স্পষ্ট করে বলেছে, এই অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ থাকবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এই প্রণালি আন্তর্জাতিক এবং এটি খোলা রাখতেই হবে। এই দ্বন্দ্বটাই আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এখানে শুধু সামরিক শক্তির প্রশ্ন না, এখানে প্রভাব, আধিপত্য এবং অর্থনীতির প্রশ্ন জড়িত।
হরমুজের পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি
হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি আরেকটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু হলো পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি—ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করে। এটি তাদের জন্য একটি ‘রেড লাইন’। কিন্তু ইরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং এটি তাদের অধিকার। তারা কোনো চাপের মুখে এই অধিকার ছাড়তে রাজি নয়। এই জায়গাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, পারমাণবিক ইস্যু মানেই শুধু একটি দেশের নিরাপত্তা নয়, এটি পুরো বিশ্বের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। এখানে সামান্য ভুল হিসাবও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
কেন কোনো চুক্তি হলো না?
দীর্ঘ আলোচনা হওয়ার পরও কেন কোনো চুক্তি হলো না?—এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, উভয় পক্ষই তাদের অবস্থানে খুব কঠোর। কেউই বড় কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে কঠোর শর্ত দিচ্ছে, অন্যদিকে তাদের অবস্থান বারবার পরিবর্তন করছে। কখনো বলছে, হরমুজ প্রণালি তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, আবার কিছুদিন পর বলছে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই ধরনের অসঙ্গতি আলোচনার বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানও কৌশলগতভাবে সময় নিচ্ছে। তারা চায়, সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে তবেই কোনো চুক্তিতে যাবে। তারা কোনো তাড়াহুড়ো করছে না। তবে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে তাদের কোনো ছাড় নেই বলে কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। এই অবস্থায় পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তারা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসিয়েছে। যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছে, কিন্তু মধ্যস্থতা করা আর স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা এক জিনিস নয়। পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এই আলোচনা যেন ভেঙে না পড়ে।
যুদ্ধ কি আবার শুরু হবে?
এখন আমরা আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে—যুদ্ধ কি আবার শুরু হবে? বাস্তবতা হলো, এই মুহূর্তে তিনটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, আলোচনা ভেঙে গেলে যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে। দ্বিতীয়ত, একটি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে, যেখানে না যুদ্ধ হবে, না শান্তি আসবে। তৃতীয়ত, ধীরে ধীরে একটি সমঝোতা তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই সবচেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত। কারণ, উভয় পক্ষই এখন সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে চাইছে, কিন্তু পুরোপুরি ছাড় দিতেও রাজি নয়। এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো বিশ্বের ওপর প্রভাব ফেলছে। তেলের বাজার, বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সবকিছু এতে জড়িত। বিশ্ব এখন একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা একটি ছোট উত্তেজনাও বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জন্য এর মানে কী?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের অবস্থা কেমন হতে পারে তা একটি বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, উভয় পক্ষই তাদের অবস্থানে খুব কঠোর। এজন্য উত্তরটাও খুবই বাস্তব। যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে জ্বালানির দাম বাড়বে। পণ্যের দাম বাড়বে। অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। অর্থাৎ, এই যুদ্ধ শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না, এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলবে।
শেষ কথা
সবশেষে বলা যায়, বিশ্ব এখন একটি সংকটপূর্ণ সময় পার করছে। যুদ্ধ থেমে আছে, কিন্তু ঝুঁকি রয়ে গেছে। আলোচনা চলছে, কিন্তু আস্থা তৈরি হয়নি। ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, অসম্পূর্ণ শান্তি কখনো স্থায়ী হয় না। তাই এখন পুরো বিশ্বের নজর এখন পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।
এই আলোচনা কি একটি স্থায়ী সমাধান আনবে, নাকি এটি শুধু আরেকটি বড় সংঘাতের পূর্বাভাস, তা বুঝতে মানুষের অপেক্ষা ছাড়া আর কি-ই-বা করার আছে। তবে, চীন ও রাশিয়ার প্রেক্ষাপট মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে সব সিদ্ধান্তের।

সৈয়দ আহসান কবীর