এলডিসি উত্তরণের পর মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির তাগিদ
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর মেধাস্বত্ব সুরক্ষা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মেধাস্বত্ব সুরক্ষার নতুন বাস্তবতা বাংলাদেশের ঔষধ, তৈরি পোশাক, তথ্য-প্রযুক্তি, কৃষি ও অন্যান্য শিল্পখাতে যেমন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে, তেমনি উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং ও মূল্য সংযোজনের নতুন সুযোগও সৃষ্টি করবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, শিল্পখাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাপোর্ট টু সাসটেইনেবল গ্রাজুয়েশন প্রজেক্ট (এসএসজিপি) এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) কর্তৃক যৌথভাবে আয়োজিত “এলডিসি-পরবর্তী সময়ে শিল্পখাতের রূপান্তর: মেধাস্বত্ব অধিকার সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ ও কৌশল নির্ধারণ” শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। সভাপতিত্ব করেন ডিসিসিআইর প্রেসিডেন্ট তাসকীন আহমেদ।
স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পণ্যের মেধাস্বত্বের বিষয়টির গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী মেধাস্বত্ব অধিকারের ইকোসিস্টেম একান্ত অপরিহার্য। বাংলাদেশের ওষুধ, তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতে সামনের দিনগুলোতে শুধুমাত্র উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নজর না দিয়ে উদ্ভাবন, ব্র্যান্ডিং, প্রযুক্তি বিনিময় এবং মূল্য সংযোজনের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তবে দেশে মেধাস্বত্ব আইনের বিদ্যমান কাঠামোগত দীর্ঘসূত্রতা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা, প্রয়োজনীয় নীতিমালার অভাব, সীমিত সক্ষমতা এবং সর্বোপরি বেসরকারি খাতে এ বিষয়ে সচেতনতার অভাবকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তাসকীন আহমেদ। একটি আধুনিক ও কার্যকর মেধাস্বত্ব অধিকার বিষয়ক কার্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আইপি ট্রাইব্যুনাল চালু করা, ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশনে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রবর্তন, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং বিশেষ করে এসএমই উদ্যোক্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন ডিসিসিআই সভাপতি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী মেধাস্বত্ব ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইনি কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা বা এসএমই খাতকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি এ খাতের ওপর আরও বেশি নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। ইআরডি সচিব বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে যেমন ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, তেমনি এসব পণ্যের ডিজাইন ও গুণমান আরও উন্নত করা গেলে তা বহির্বিশ্বে রপ্তানিরও ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, গবেষণা খাতে বাজেট বরাদ্দ থাকলেও তা ব্যবহৃত হচ্ছে না। আবার এ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নেই—এমন অভিযোগও রয়েছে। তার মানে হলো, সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, যা নিরসন করা প্রয়োজন।
ইআরডি সচিব জানান, এসএমই খাতের জন্য সরকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করছে। তবে এ ধরনের বরাদ্দ বাস্তবায়নে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়ানো ও টেকসই উন্নয়ন জরুরি। তিনি বলেন, সরকার এসএসজিপি প্রকল্পের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে খাতভিত্তিক কারিগরি সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংস্কার করা হবে। তবে বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরও জানান, সরকারি সব ধরনের সেবা ডিজিটাল কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা শিগগিরই চালু হবে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ এবং ওয়াইপো একাডেমির সাবেক পরামর্শক মোহাম্মদ আতাউল করিম। তিনি বলেন, এলডিসি-উত্তর যুগে বাংলাদেশের শিল্পখাতকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে মেধাস্বত্ব অধিকার বা আইপিআরকে কৌশলগতভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, ওষুধ, সফটওয়্যার ও আইটি, কৃষি, ও শিল্প-নকশাসহ বিভিন্ন খাতে ট্রিপস্ ও সম্ভাব্য ট্রিপস্-প্লাস বাধ্যবাধকতা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। একইসঙ্গে এগুলো উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও শিল্পের রূপান্তরের সুযোগও তৈরি করবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিদ্যমান আইপিআর সংক্রান্ত আইনি নমনীয়তা কাজে লাগানোর পাশাপাশি গবেষণা ও উন্নয়ন, শিল্প-শিক্ষাঙ্গন সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনে প্রণোদনা বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে এসএসজিপির প্রকল্প পরিচালক ও ইআরডির অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম জাহাঙ্গীর বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে আমাদের বেসরকারি খাত। এক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব আইনের যথাযথ প্রয়োগ, শিল্পখাতের প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন একান্ত অপরিহার্য।
এছাড়া অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, কপিরাইট অফিস বাংলাদেশের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত সচিব) এস এম আরশাদ ইমাম, এসএসজিপির প্রকল্প উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব আবদুল বাকী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (ট্রেড সাপোর্ট মেজারস উইং) ড. সাইফ উদ্দিন আহম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুরেজা এম. মুজারেবা, বাংলাদেশ এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান, বিজিএমইএর সেক্রেটারি জেনারেল মেজর জেনারেল ড. মো. শাহেদুল ইসলাম (অব.), ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর মহাপরিচালক মো. আজিজুর রহমান, ব্রেইন স্টেশন ২৩ লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাইসুল কবির এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ফায়েজ আহমেদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এলডিসি-পরবর্তী সময়ের চ্যালেঞ্জ উত্তরণে শিল্পের প্রতিটি খাতের নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং এ লক্ষ্যে সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যথাযথ উদ্যোগ ও সহযোগিতা প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি।
এসএসজিপির প্রকল্প উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব আবদুল বাকী বলেন, এলডিসি উত্তরণের বর্ধিত সময়সীমা ভালোভাবে কাজে লাগাতে সরকারি সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে।
মেজর জেনারেল ড. মোঃ শাহেদুল ইসলাম (অব.) বলেন, এলডিসি-উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের নিজস্ব মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগ ও উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা সহায়তা প্রদান জরুরি। বিজিএমইএ ইতোমধ্যে একটি সেন্টার অব এক্সিলেন্স স্থাপন করেছে, যেখানে তৈরি পোশাক খাতে নতুন পণ্যের ডিজাইন ও মেধাস্বত্ব নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
এগ্রোকেমিক্যাল খাতকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করে কার্যকর ও যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করার আহ্বান জানান এগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী মোস্তাফিজুর রহমান।
রাইসুল কবির বলেন, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ওপর প্রাধান্য না দিয়ে শুধুমাত্র আউটসোর্সিংয়ের জন্য কাজ করলে আগামীতে সফল হওয়া যাবে না। তাই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উদ্ভাবনের ওপর বেশি হারে নজর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে শিক্ষা ও শিল্পখাতের সমন্বয় এবং আইপি নিরাপত্তা ও মেধাস্বত্ব আইনের কার্যকর প্রয়োগে আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ফায়েজ আহমেদ বলেন, ঔষধ খাতে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে দেশীয় বাজারে আন্তর্জাতিকভাবে মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগ করলে ঔষধের দাম বেশ বাড়বে, ফলে দেশের জনগণ ভুক্তভোগী হবে। তাই বিষয়টির দিকে নজর দিতে হবে। তবে সেক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নিজস্ব পণ্যের ব্র্যান্ড তৈরি, মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অ্যাসোসিয়েশনের মহাপরিচালক মো. আজিজুর রহমান।
নতুন পণ্য ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় বাড়ানো এবং উৎপাদিত পণ্যের জিআই নিবন্ধনের পাশাপাশি বাণিজ্যিকীকরণের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুরেজা এম. মুজারেবা।
ডিসিসিআই পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক