ধ্বংসস্তূপ থেকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য ও সংকট উত্তরণে পথরেখা
জনবান্ধব বাজেটসহ ২০৩৪ সালে মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে চায় সরকার, একথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পকিল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেছেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকার, তাই নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি পূরণে বদ্ধপরিকর। মানবিক-গণতান্ত্রিক এবং কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে সে লক্ষ্যই প্রতিফলিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, সরকারের সংস্কারের ব্যাপারে সংশয় থাকায় আইএমএফ অর্থ প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে জানিয়ে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সংস্কারের বিষয়ে সরকারের বাস্তবায়নে অনীহা দেখে বিদেশিরা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) দেশের জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভির ‘কেমন বাজেট চাই’ অনুষ্ঠান ঘিরে অংশীজনদের প্রত্যাশার এসব কথা উঠে আসে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত এনটিভির স্টুডিওতে রাত সোয়া ৮টায় শুরু হয় এই অনুষ্ঠান। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদরা অংশগ্রহণ করেন। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রত্যাশাগুলোকে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এই আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি কিসের মধ্যে রেখে বিগত সরকার চলে গেছে, সবার বিষয়টি জানা আছে জানিয়ে উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থনীতিতে নিম্ন গতির বিষয়ে আমরা সবাই অবগত। আমরা যে বিষয়টি করতে চাই তা হচ্ছে বৈধতা থাকলে এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া দরকার। এক্ষত্রে জনগণের অংশগ্রহণ দরকার এবং আলোচনা ও সমালোচনা শোনার সেই সক্ষমতাও থাকা দরকার। তার আলোকেই নির্বাচনি ইশতেহারে আমরা কতগুলো বিষয় উল্লেখ করেছি এবং পুরো অর্থনৈতিক কৌশল ও সংস্কার সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার করেছি।
নির্বাচনি ইশতেহারে পাঁচটি অধ্যায় ছিলো জানিয়ে ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, প্রথম হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সংস্কার, দ্বিতীয় হলো বৈষম্যহীন আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি। তৃতীয় হলো ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও পুর্নগঠন। চতুর্থ হলো সমতা ভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিভাজন নয়, সংহতি প্রতিষ্ঠা করা এবং অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ইতোমধ্যে আপনারা জানেন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় পরিচালনার ক্ষেত্রে তার ভিশন উল্লেখ করেছেন। এতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানসহ সকল চেতনা ধারণ করে। মানবিক-গণতান্ত্রিক এবং কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে সে লক্ষ্যই প্রতিফলিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মাত্র তিন মাস হলো নতুন সরকার এসেছে। তাদের সংকটকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তাদের একইসঙ্গে বিদেশিদের চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এটা নিয়ে কারো কোনো ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। কীভাবে আমরা সংকট মোকাবিলা থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারি সেটি দেখা দরকার।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, আমাদের এখন উচিত সংকটের মধ্যে কীভাবে আমরা এই সংকট থেকে উত্তরণ করতে পারি। সেক্ষেত্রে প্রথম সমস্যা হলো সরকার গত তিন মাসের সংকট নিয়ে কোনো দলিল তৈরি করেনি।
অর্থমন্ত্রীর গত তিন মাসের জন্য কোনো কৌশলপত্র ছিল না জানিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, যে সকল কৌশল ধরে এ স্বল্প সময়ে আমরা এটা করতে চাই। কিন্তু তা করতে পারেনি। আমি বলব আগামী বাজেট নিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারলেন না অর্থাৎ অর্থনীতিকে রাজনীতি দিয়ে যে ব্যাখা করা এটা সরকার করতে পারেনি। আমরা যেটাকে বয়ান বলে থাকি। আমরা বলবো সরকারের উচিত ছিল বিনিয়োগকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আগামী বাজেটকে দেখতে চাইবো বিনিয়োগ বান্ধব। সরকার গরীব মানুষের জন্য কৃষক কার্ড, ফ্যামেলি কার্ড দেবে কিন্তু এসবতো সবাইকে দিতে পারবেন না। প্রত্যেক বাড়িতে তো কর্মসংস্থান দরকার হবে। এছাড়া আয়-ব্যয় ও ঘাটতির অর্থায়ন হলো বাজেটের একটি হৃদপিণ্ড।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আমরা প্রতি বছর দেখি যে, বাজেটে আয়ের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তি বলা হয়। পরে দেখা যায় এটা বাস্তবায়ন হয়নি। এটাকে ইংরেজিতে বলা হয় ফিসকাল ডিসিপ্লিন না থাকা। এতে শিক্ষা-স্বাস্থ্যখাতে সময়মতো টাকা পাওয়া যায় না। আমরা দেখছি এ সরকারের সময়ে অনেক কিছু বিচ্ছন্নভাবে হচ্ছে কিন্তু সংস্কারের ধারাবাহিকতা নেই। দেখুন সরকার তার মেনিফেস্টোতে বলেছে একটি অর্থনীতি রিফর্ম করবে, তা কিন্তু হয়নি। পুঁজিবাজার সংস্কারের ব্যবস্থা করবেন, কিন্তু তাও করেননি। ওখানে ব্যক্তি নিয়োগ দিচ্ছেন কিন্তু সংস্কারের কিছু দেখা যাচ্ছে না। এমনকি এনবিআরকে যে চারটা ভাগে ভাগ করলাম তাও বাস্তবায়ন করতে পারলো না সরকার। এতে করে সংস্কারের ব্যাপারে সংশয় থাকায় আইএমএফ অর্থ প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। অর্থাৎ সংস্কারের বিষয়ে সরকারের বাস্তবায়নে অনীহা দেখে বিদেশিরা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, পদ্মা ব্যারেজ বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির মধ্যে আছে। আমিও এটার পক্ষে আছি। ফারাক্কার কাজের ফলে ওখানে যে শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, ওই এলাকার মানুষের জন্য, তাদের সেচ ব্যবস্থার জন্য পদ্মা ব্যারেজ দরকার আছে। তবে কীভাবে এটাকে অর্থায়ন করবেন এবং কত বছর ধরে অর্থায়ন করবেন, সেটার একটা বিষয় এখানে রয়ে গেছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আমাদের সাবসিডি বিভিন্ন খাতে দেওয়া হয়। কিন্তু দেখতে হবে গরীবের টাকা দিয়ে যেন বড়লোক সাবসিডি না পায়। আর্থিক কাঠামো হলো প্রাণ। আয় ব্যয় এবং ঘাটতি না থাকলে বাজেট বোঝা যাবে না। বাজেট যদি হৃদপিণ্ড হয়, তাহলে তার ফুসফুস হলো ব্যাংকিং খাত এবং জ্বালানি খাত। ব্যাংকিং খাত এবং জ্বালানি খাতে অগ্রগতি না করতে পারলে অন্যখাতে অগ্রগতি হবে না।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, একটি প্রশ্ন হলো আয় কোথা থেকে আসবে। এ বিষয়টা বেশ কঠিন। দ্বিতীয়, ব্যয়টা যে করবে এটা ঠিকমত কার্যকর হবে কি হবে না এবং এই মুহূর্তের প্রয়োজন মেটাবে কি মেটাবে না। আয়ের ক্ষেত্রে আমরা যেটা বলতে চাচ্ছি, এটা হলো যে, সরকারের পক্ষ থেকে আমরা বলি ট্যাক্সপ্যান্ডিচার।
আমি অর্থমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছি আপনি যদি না পারেন তাহলে সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুল রহমানের আমল থেকে যেটা আটকে রয়েছে সেটা হবে না জানিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারের যে শেয়ার রয়েছে সেগুলো পুঁজিবাজারে ছাড়তে হবে। পুঁজিবাজারকে তেজী করার জন্য এটা অন্য রকম পদক্ষেপ। যেটা মাল্টিন্যাশনাল শেয়ার আছে এবং স্টেট এন্টারপ্রাইজের শেয়ার আছে এগুলো আপনাকে পুঁজিবাজারে দিতে হবে। আমি একইভাবে বলে যাচ্ছি, আমাদের সাবসিডি যেগুলো দেওয়া হচ্ছে এবং বিভিন্ন খাতে দেওয়া হয়। কিন্তু দেখতে হবে গরীরের টাকা দিয়ে যেন বড়লোক সাবসিডি না পায়। এটা স্বচ্ছভাবে মূল্যায়নের সুযোগ আছে।
কৃষি খাতে ভর্তুকি ১৭ হাজার কোটি টাকা। ভর্তুকির এই টাকা কোথায় যায়, কে পায়- তা বুঝতে পারি না মন্তব্যে করে কনজ্যুমার্স অ্যাসেসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, কৃষিতে ১৭ হাজার কোটি টাকা কীভাবে বেনিফিট পায় সেটা পরিকল্পনা কমিশনও বলতে পারবে না। শামসুল আলম বলেন, আইনে বলা আছে, কৃষি বলতে মাছ চাষ থেকে সব কিছু। মাছও কৃষির মধ্যে পড়ে। তাহলে মাছ সেচের জন্য কেন শিল্প রেটে বিদ্যুৎ দিতে হবে? এটার জন্য হাইকোর্টে মামলা করতে হয়েছে।
আমরা ব্যবসায়ীরা কঠিন সময় অতিক্রম করছি, গত দুই দশকেও এ অবস্থা ছিল না জানিয়ে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, এটা বলা যাবে না যে, বর্তমান সরকারের তিন মাসেই এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, সেটা নয়। এটা দীর্ঘদিনের। আমরা দীর্ঘদিন গ্যাস সংকটে ভুগছি। গ্যাস সংকটে প্রায় ৪০ শতাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। এই কষ্ট তাদের বহন করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের সুদের হার, আমরা যখন তিন থেকে চার বছর আগে প্রজেক্ট নিয়েছিলাম তখন আট থেকে নয় শতাংশ ছিল। এখন সেটি ১৪ শতাংশের পৌঁছেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি। এতো সুদ দিয়ে কোনো ব্যবসা টিকে থাকতে পারে না, এটাই বাস্তবতা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যবসায়ীদের কথা দিয়েছেন, কর কমাতে পারবেন না কিন্তু বাড়াবেনও না জানিয়ে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তবে পলিসি সাপোর্ট লাগলে তিনি তা দেবেন। বর্তমান সরকারকে আমি বলবো, সরকারের কর পলিসি পুরোপুরি বিনিয়োগ পরিপন্থি। যদি কোনো ব্যবসায়ী একশ কোটি টাকার পণ্য এক্সপোর্ট করে তাহলে এআইটি হিসেবে তার কাছ থেকে কেটে নেওয়া হচ্ছে এক কোটি টাকা জানিয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, তাহলে ১২ শতাংশ কর-ভ্যাট দেওয়ার পর প্রফিট করতে হবে তাকে আট কোটি টাকা। যেটা ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। দেখা গেল এক কোটি টাকা যা কর নিয়ে গেল রিটার্ন দাখিলের সময় আমাকে ফেরত দিচ্ছে না। আবার এ ফাইলের মধ্যে টিডিএস বাবদ ধরছে। এছাড়া সোর্স থেকে ১৭ শতাংশ কেটে নেওয়া হচ্ছে। একদিকে এনবিআর বলছে, শুরুতে এক কোটি টাকা না দিলে আমি রিটার্ন দাখিল করতে পারবো না। সমন্বয় নাই। এ ধরনের অত্যাচার থেকে ব্যবসায়ীদের রক্ষা করেন। বন্ধ হওয়া ফ্যাক্টরিগুলো সচল করার ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছেন, এ জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই, এটা সাহসী উদ্যোগ। আমরা তিনদিন আগেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি। আমাদের বেশি দরকার পলিসি সাপোর্ট বলে জানান তিনি।
আসন্ন বাজেট নিয়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, আমি কেবল একটি গ্রহণযোগ্য বাজেট দেখতে চাই। আমাকে যদি প্রশ্ন করেন বাজেট কেমন দেখতে চাই, আমি এক কথায় বলবো— এইবার অন্তত একটা গ্রহণযোগ্য বাজেট দেখতে চাই।
শিল্পকারখানায় জ্বালানি সংকটের চিত্র তুলে ধরে শওকত আজিজ রাসেল জানান, গতকাল তার ফ্যাক্টরিতে ১৩ ঘণ্টা গ্যাস ছিল না এবং এটি কেবল তার একার নয়, বরং দেশের সব ব্যবসায়ীর বর্তমান সমস্যা। তিনি বাজেটে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণের ওপর জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও এর পাশাপাশি সরকারকে শিল্প নিয়েও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। শুধু বাজেট প্রণয়ন করলেই হবে না, এর সঙ্গে প্রয়োজনীয় পলিসি রিফর্ম বা নীতি সংস্কারের বিষয়টি যুক্ত করা জরুরি।
দেশের বস্ত্র খাতের করুণ দশা তুলে ধরে শওকত আজিজ বলেন, সরকার যেখানে এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে নগদ প্রণোদনাসহ নানা সুবিধা দিয়েছে, সেখানে কিছু ভ্রান্ত নীতির কারণে দেশি মেশিনগুলো আজ জং ধরছে। পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি জানান, ২০২২-২৩ সালে দেশে ১৪ হাজার কোটি টাকার সুতা আমদানি হয়েছিল, যা ২০২৪-২৫ সালে বেড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এসময় অভিযোগ করে শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বিদেশ থেকে কম দামে বা প্রণোদনা প্যাকেজ সংবলিত সুতা আমদানির ফলে দেশীয় ইন্ডাস্ট্রিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অথচ সরকার এই শিল্প পুনরুজ্জীবিত করতে কার্যকর কোনো পলিসি নিচ্ছে না। তিনি বলেন, যে উদ্যোক্তা ২০ বছর ধরে সততার সঙ্গে ব্যবসা করে ব্যাংকের টাকা ফেরত দিয়েছেন, বর্তমানে নতুন মেশিনারিজ বা টিকে থাকার জন্য তার যে সামান্য মূলধনের প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করার জন্য বাজেটের পাশাপাশি সঠিক সহায়ক নীতি বা পলিসি ডিমান্ড করেন তিনি।
এদিকে ‘কেমন বাজেট চাই’ অনুষ্ঠানে কথা বলছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাধারণ মানুষ। শ্রেণি-পেশা ভেদে তারা জানিয়েছেন তাদের প্রত্যাশার কথা। তারা বলেন, আসন্ন বাজেট হবে তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের। হবে জনবান্ধব, জনস্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন ও ব্যবসাবান্ধব।
প্রত্যাশার কথা বলতে গিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একজন প্রতিনিধি জানান, আগামী বাজেটে ভোলায় নদীভাঙন প্রতিরোধে একটি টেকসই ও স্থায়ী বাঁধব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভোলার নদীভাঙন রোধ পায়। আরেকজন নাগরিক বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩৩ লাখ মানুষের জন্য এ বাজেটে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বাজেট ঘিরে প্রত্যাশা সম্পর্কে একজন ওষুধ দোকানদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের ওপর যে ভ্যাট ও ট্যাক্সের বোঝা আছে তা কমাতে হবে। পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে হবে। নিজের বাজেট ভাবনার কথা বলতে গিয়ে একজন নারী বলেন, বাজেট নারীবান্ধব হতে হবে। নারীবান্ধব না হলে আমরা নারীরা এগিয়ে যেতে পারব না।
আসন্ন ২০২৬-২৭ বাজেট ঘিরে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের চাওয়া, বাজেট যেন শ্রমবান্ধব হয়। পাশাপাশি যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে, তাদের জন্য খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং তা ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকতে হবে। তাদের জীবনমান সহজ করতে হবে। একজন শ্রমিক বলেন, আমরা যারা শ্রমিক, আমাদের আয়ের বেশির ভাগই আবাসন খাতে চলে যায়। আমরা দাবি করি, শ্রমিকদের আবাসনের ব্যবস্থা মালিকদের করতে হবে। ক্ষুদ্র ঋণ নেওয়ার পর এক বছর পর্যন্ত যেন কিস্তি দিতে না হয়। আর এই এক বছরে তারা কী কাজে টাকাটা ব্যয় করছে, সেটিও তদারকি করতে হবে। ঢাকার বাইরের বাসিন্দারা বলেন, ঢাকায় বসে বাজেট করলে চলবে না। জেলার মানুষের চাহিদা জানতে প্রতিটি জেলায় গিয়ে বাজেট পরিকল্পনা করতে হবে।
একজন স্বাস্থ্যকর্মী তার বাজেট নিয়ে ভাবনার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, কিছু রোগ আছে, যেগুলো আগেভাগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। সেসব বিষয়ে বিনিয়োগ ও জনস্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গবেষণায় বাজেট বাড়াতে হবে। তাহলে হাসপাতালে যে চাপ পড়ছে, সেটা কমবে। চিকিৎসা খাতে খুবই দুরবস্থা। সরকারি হাসপাতালগুলোতে যে পরিমাণ বাজেট থাকা দরকার, তা নিশ্চিতে খেয়াল রাখতে হবে। গ্রাম থেকে শহর— সব ক্ষেত্রে বাজেট বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কাছে আমরা আলাদা বাজেট দাবি করছি। নিজের বাজেট ভাবনার বিষয় জানাতে এক তরুণ বলেন, জনগণ যেন সরাসরি উপকৃত হয়, এমন বাজেট চাই। গণঅভ্যুত্থান হয়েছে যে রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে, সেই জায়গা থেকে সরকারের উচিত জনসাধারণের কথা মাথায় রেখে বাজেট তৈরি করা।

নিজস্ব প্রতিবেদক