ঢাকার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যে অর্জন বাংলাদেশের
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সফল যোগদান ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় কর্মসূচি সম্পন্ন করে দেশের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্ক ত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় আজ শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং উচ্চপর্যায়ের একটি সরকারি প্রতিনিধিদল রয়েছে। বিমানবন্দর ও তাঁদের অবস্থানস্থল নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের সামনে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দলীয় বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানান। তবে সরাসরি দেখার আক্ষেপ থেকে হতাশাও ছিল অনেকের মাঝে।
জাতিসংঘে বাংলায় ঐতিহাসিক ভাষণ ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ‘৩-আর’ কৌশল–
সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল গতকাল ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের বাংলায় প্রথম ভাষণ প্রদান। তিনি তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের কথা তুলে ধরেন। গণতান্ত্রিক ধারা পুনর্প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে তাঁর সরকারের ‘৩-আর’ (রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন ) কৌশলের কথা বিশ্বমঞ্চে ঘোষণা করেন।
ভাষণে তিনি আরও যে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন–
রোহিঙ্গা সংকট: মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানান।
জলবায়ু ও পরিবেশ: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষায় দেশব্যাপী আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ এবং ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন।
প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক শান্তি: তরুণদের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের স্টার্ট-আপ ফান্ড বরাদ্দ, বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর, ফিলিস্তিনের স্বাধিকার রক্ষা এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
কূটনৈতিক ব্যস্ততা ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক–
নিউইয়র্কে অবস্থানকালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় ও বাণিজ্যিক বৈঠকে মিলিত হন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান, ক্রোয়েশিয়া ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে পারস্পরিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, আঞ্চলিক স্থায়িত্ব এবং বৈশ্বিক নানা সংকট মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
এছাড়া বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও মার্ক সুজম্যানসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্কের বৈঠক হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, এসব বৈঠক ও কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক শান্তিসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি, জাতিসংঘের সাইডলাইনে চারটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান, ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আরও কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর এই অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নতুন ভাবমূর্তি তুলে ধরতে এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রার যোগসূত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

জাকের হোসেন, নিউইয়র্ক থেকে