হাসপাতালের সংস্কারকাজ ফেলে উধাও ঠিকাদার, দুর্ভোগে রোগীসহ সেবা গ্রহীতারা
নওগাঁর সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে এসে সুস্থ হওয়ার বদলে উল্টো চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন রোগীসহ সেবা গ্রহীতা সাধারণ মানুষ। হাসপাতালটির সংস্কারকাজ মাঝপথে ফেলে ঠিকাদার উধাও হয়ে যাওয়ায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। আউটলেট ট্যাংকির ভাঙা অংশ থেকে উপচেপড়া মল-মূত্রের তীব্র পচা গন্ধে হাসপাতালের বহির্বিভাগের চারপাশ শুধু বিপর্যস্তই নয়; সেবা নিতে আসা মানুষের সেখানে টেকাই দায় হয়ে পড়েছে। এ সমস্যা সমাধানে হাসপাতালের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও মিলছে না কোনো প্রতিকার।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগের সংস্কারকাজের দায়িত্ব পান দেলোয়ার হোসেন নামের এক ঠিকাদার। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কাজ পুরোপুরি শেষ না করেই উধাও হয়ে গেছেন তিনি। ফলে নষ্ট হওয়া টয়লেটের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা আর ঠিক করা হয়নি। বর্তমানে আউটলেট ট্যাংকির ভাঙা অংশ দিয়ে মল-মূত্র বাইরে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করেছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা জানান, দূরদূরান্ত থেকে নানা বয়সের মানুষ একটু সুস্থতার আশায় ছুটে আসেন এই হাসপাতালে। অথচ বহির্বিভাগের সামনে পা রাখতেই তাঁদের নাকে রুমাল চাপা দিতে বাধ্য হতে হয়। টিকিট কাটা থেকে শুরু করে চিকিৎসকের কক্ষের সামনে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা—প্রতিটি মুহূর্তেই তাঁদের সহ্য করতে হচ্ছে এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ঠিকাদারের এমন চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার মাশুল গুনতে গিয়ে আজ পুরো হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসাবান্ধব পরিবেশ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়েছে।
হাসান আলী নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘আমার এক আত্মীয়কে দেখতে হাসপাতালে এসেছিলাম। এসে দেখি টয়লেটের দুর্গন্ধ পুরো চত্বরে ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে মানুষ সুস্থ হতে আসে, সেখানে এসে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ার জোগাড় হয়েছে! দ্রুত এই সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান করা দরকার।’
সুমাইয়া আক্তার নামে আরেক রোগীর স্বজন বলেন, ‘হাসপাতালে মানুষ আসে একটু স্বস্তি পেতে, কিন্তু এখানে এসে দেখছি উল্টো ভোগান্তি। টয়লেটের মল-মূত্র বাইরে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাতে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে। কর্তৃপক্ষের কি এদিকে কোনো নজরই নেই?’
চিকিৎসা নিতে আসা রোগী মোস্তফা কামাল বলেন, ‘অসুস্থ শরীর নিয়ে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এমনিতেই কষ্টকর, তার ওপর এই পচা গন্ধের চোটে এখানে এক মুহূর্তও টিকতে পারছি না। ডাক্তার দেখানোর আগেই বমি আসার মতো অবস্থা তৈরি হয়ে গেছে।’
কাজের এমন গাফিলতির বিষয়ে জানতে ঠিকাদার দেলোয়ার হোসেনের মোবাইলফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালটির আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রাশিদ নায়ীব সিজান বলেন, ‘শুধু রোগ নির্ণয় বা ওষুধ লিখে দেওয়াই চিকিৎসা নয়; সবার সেবা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। ঠিকাদারের এ ধরনের অসমাপ্ত কাজ চিকিৎসাসেবা ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সেবার মানের সঙ্গে কোনো আপস করতে চাই না।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘রোগী ও স্বজনদের সীমাহীন দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে এই সমস্যা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে আমরা একাধিকবার লিখিত অনুরোধ জানিয়েছি।’
নওগাঁ সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলামের সাথে মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি জানান, সাপাহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংস্কার কাজ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, রাজশাহী থেকে করা হচ্ছে। কোন কারণ ছাড়াই ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে রেখেছে। ঠিকাদার কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যাওয়ায় রোগীসহ সেবা গ্রহীতারা চরম দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে পড়েছে।
ডা. আমিনুল ইসলাম আরও জানান, এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী নওরোজ মোহাম্মদ তারেকের সাথে কথা হলে তিনি জানান, পুরাতন ঠিকাদার দিয়ে হোক আর নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করেই হোক অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে বাকি কাজ সম্পন্ন করা হবে।
এ সমস্যার বিষয়ে কথা বলার জন্য আজ শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, রাজশাহীর নির্বাহী প্রকৌশলী নওরোজ মোহাম্মদ তারেকের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল দেওয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ