বন্ধুর ল্যাপটপে শুরু, এখন মাহমুদের মাসে আয় ২-৫ লাখ টাকা
নিজের কোনো কম্পিউটার বা স্মার্টফোন ছিল না। বন্ধুর ল্যাপটপে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড শেখার মাধ্যমে তার শুরু। এলাকার এক বড় ভাইয়ের ফোনে ভিডিও দেখে এবং অনলাইনে প্রশিক্ষণ নিয়ে ধীরে ধীরে দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। পরে কৃষক বাবার ধান বিক্রির অগ্রিম টাকা ও একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কেনা হয় তার প্রথম ল্যাপটপ।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে ২০১৮ সালে অনলাইনে কাজ শুরু করেন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বেতগাড়া গ্রামের মাহমুদ সরকার। ফাইভারে পাওয়া নাইজেরিয়ার এক ক্লায়েন্টের ২০ ডলারের কাজ ছিল তার প্রথম আয়। কাজটি ছিল ইনস্টাগ্রামের ফলোয়ার বাড়ানো। প্রথম ১০০ ডলার আয় করে সেই টাকা মায়ের হাতে তুলে দেন তিনি।
কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের দক্ষতা বাড়ান মাহমুদ। পরে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের পাশাপাশি অ্যাপস ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন অনলাইন কাজ শুরু করেন। বর্তমানে ফাইভারে তিনি টপ রেটেড সেলার। তার প্রোফাইলে রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ রিভিউ। মাহমুদের দাবি, এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় ৬ থেকে ৭ হাজার প্রজেক্ট সম্পন্ন করেছেন।
ফাইভারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কাজ করছেন তিনি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন। নিয়মিত ক্লায়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৫০ জন। কাজ ও প্রজেক্টের ওপর নির্ভর করে তার মাসিক আয় সাধারণত ১ হাজার ডলারের বেশি, কোনো কোনো মাসে তা ৩ থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত হয় বলে জানান মাহমুদ। টাকার হিসেবে যা মাসে প্রায় ২-৫ লাখ টাকা।
শুধু নিজের আয়েই থেমে থাকেননি তিনি। অন্যদের কাজের সুযোগ করে দিতে গড়ে তুলেছেন সারকার জেনট্রক্স ল্যাব নামে একটি এজেন্সি। সেখানে বর্তমানে ২২ জন তরুণ-তরুণী নির্দিষ্ট বেতনে কাজ করছেন।
মাহমুদ সরকার বলেন, দেশের বাইরে থেকে ডলার আয় করার পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করাই তার অন্যতম লক্ষ্য। তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা শুধু আরবি পড়তে পারে। আমি আমার চেষ্টা দিয়ে সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করতে চেয়েছি। বন্ধুর ফোন ও ল্যাপটপে কাজ শিখেছি। ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকলে শেখা সম্ভব।
নিজের সাফল্যের পেছনে পরিবারের অবদানের কথা উল্লেখ করে মাহমুদ বলেন, আমার বাবা ধান বিক্রি করে আমাকে ল্যাপটপ কিনে দিয়েছিলেন। এটি আমার জন্য বড় অনুপ্রেরণা। বাবা-মা আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছেন, আমাকে সুযোগ দিয়েছেন। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
মাহমুদের সঙ্গে কাজ করেন রাসেল মিয়া। তিনি বলেন, প্রায় পাঁচ মাস ধরে মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করছি। তিনি আমাকে কাজ শেখানোর পাশাপাশি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা বেতন দেন। এতে আমার পড়াশোনার খরচ চালাতে সুবিধা হচ্ছে।
জোড়াবাড়ী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাহিরুল ইসলাম বলেন, মাহমুদ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। তার বাবার সন্তানদের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ছিল। আমার মনে হয়, সেই বিশ্বাস ও মাহমুদের পরিশ্রমই তাকে আজ সফল করেছে।
প্রায় দেড় বছর গ্রামের বাড়িতে বসেই ফ্রিল্যান্সিং করেছেন মাহমুদ। পরে কাজের পরিধি বাড়ায় নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের সুবিধার জন্য রংপুরে চলে যান। বর্তমানে নিজের কাজের পাশাপাশি এজেন্সির কর্মীদের কাজও তদারকি করছেন তিনি।

ইয়াছিন মোহাম্মদ সিথুন, নীলফামারী