পুলিশের দাবি ‘আ.লীগ নেতা’, আইনজীবীর দাবি ‘বিএনপি কর্মী’
ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সদস্য গোলাম মোস্তফাকে গ্রেপ্তারে বাধা এবং পুলিশ সদস্যদের মারধরের অভিযোগে করা মামলায় ১৬ জনকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। আজ রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রৌনক জাহান তাকি এই আদেশ দেন।
এদিন আদালতে আসামিদের পক্ষে তাদের আইনজীবী ঢাকা বারের (ঢাকা আইনজীবী সমিতি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নজরুল ইসলাম ফৌজদারী কার্যবিধির ২৪১ (ক) ধারায় অব্যাহতির আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারক অব্যাহতির আবেদনটি মঞ্জুর করেন।
এ বিষয়ে আদালতের বেঞ্চ সহকারী আবু আব্দুল্লাহ এনটিভি অনলাইনকে বলেন, আজ ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সদস্য গোলাম মোস্তফাসহ ১৬ জনের অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য ছিল। আইনজীবী অব্যাহতির আবেদন করলে তা মঞ্জুর করা হয়। এই মামলায় ১৬ জনই অব্যাহতি পেয়েছেন।
অব্যাহতি পাওয়া আসামিরা হলেন- গোলাম মোস্তফা, মো. আনিসুর রহমান, আরিফুল হাসান মীর, সাগর মীর, সোহেল শাহরিয়ার, মো. দেলোয়ার হোসেন মন্ডল, আব্দুল্লাহ শেখ, মো. রাজির শিকদার, মো. আসলাম শিকদার, মো. হাসনাত সরদার হাসান, মেহেদী হাসান সাব্বির, মো. জহিরুল ইসলাম, আরিফিন আলম ওরফে ইমন, আসাদুজ্জামান ওরফে আসাদ, সানিয়াত সরদার এবং হাছিব মুন্সি।
এদিকে, মামলার প্রধান আসামি গোলাম মোস্তফার পরিচয় মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্রে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সদস্য উল্লেখ রয়েছে। অপরদিকে আজ রোববার আসামিপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ নজরুল ইসলাম অব্যাহতির শুনানির সময় আসামি গোলাম মোস্তফা বিএনপির সক্রিয় সদস্য বলে একটি প্রত্যয়নপত্র দাখিল করেন। প্রত্যয়নপত্রের একটি কপি এনটিভি অনলাইনের হাতে এসেছে।
প্রত্যয়নপত্র থেকে দেখা গেছে, জামালপুর সদরের ৭ নম্বর ঘোড়াধাপ ইউনিয়ন শাখার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সভাপতি এম এ রশিদ মাস্টার আসামি গোলাম মোস্তফা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং সক্রিয় সদস্য হিসেবে অবহিত করেছেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী যা বললেন
আসামি পক্ষের আইনজীবী সৈয়দ নজরুল ইসলাম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, এই মামলায় গোলাম মোস্তফার পদবী আওয়ামী লীগনেতা দেওয়া হলেও বাস্তবিক তিনি বিএনপির। পুলিশ তাকে না জেনেই আওয়ামী লীগনেতার ট্যাগ দিচ্ছে। তার বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পরে একটি জুলাই বৈষম্যের মামলা হয়। যে মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই বৈষ্যমের মামলা থেকে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৭৩ (ক) ধারায় পুলিশ তাকে অব্যাহতি দেয়। এই কারণে আজ মামলা থেকে তিনিসহ ১৬ জন অব্যাহতি পেয়েছেন।
আইনজীবী সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, এই মামলায় ১৬ জন বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী রয়েছে। সবার কাগজ আদালতে দাখিল করা হলে আদালত তাদের অব্যাহতি দিয়েছেন। তবে আসামিদের আওয়ামী লীগনেতা বানিয়ে হয়রানি করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলেননি।
অব্যাহতির আবেদনে যা বলা হয়েছে
আইনজীবী অব্যাহতির আবেদনে উল্লেখ করেন, আসামিরা সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং কোনো অপরাধ করেন নাই। আসামিদের রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্য এই মামলার এজাহারে এবং পরবর্তীতে অভিযোগপত্রে নাম অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে।
অব্যাহতির আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার সময় আসামিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না এবং ঘটনা সম্পর্কে কোনো কিছু জানেন না। এছাড়া পুলিশ কমর্কতা ছিনতাই প্রতিরোধ ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার এবং ওয়ারেন্ট তামিলের ডিউটির উদ্দেশ্যে বের হয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে অবৈধ, অনৈতিক লাভের আশায় আসামি গোলাম মোস্তফার (৫৮) নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা না থাকা স্বত্ত্বেও আসামিকে গ্রেপ্তার করতে গেলে বাদী (পুলিশ সদস্য) নগদ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে গ্রেপ্তার করা হবে এমন ভয়ভীতি দেখায়। আসামি এবং আশপাশের লোকজন বাদী/পুলিশের আইডিকার্ড, গ্রেপ্তারি ওয়ারেন্ট দেখাতে বললে বাদী (পুলিশ সদস্য) কোনো কিছুই উপস্থাপন করতে পারেননি। এ সময় লোকজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করে এবং বাদী আইডিকার্ড ও গ্রেপ্তারি ওয়ারেন্ট দেখাতে না পারলে বিনা কারণে আসামিকে নিতে পারবে না বলে জানায়। এছাড়া মামলাটি তদন্তকারী কর্মকর্তা সঠিকভাবে তদন্ত করেন নাই। যদি সঠিকভাবে ওই মামলাটি তদন্ত করতো তাহলে অভিযোগপত্র না দিয়ে ফাইনাল রিপোর্ট প্রদান করতো। তাই আসামিদের অব্যাহতির আবেদন মঞ্জুর করার অনুরোধ করা হচ্ছে।
অব্যাহতির আবেদন থেকে জানা গেছে, মামলার বাদী একজন পুলিশ কর্মকর্তা। মামলার বাদী এজাহারে একজন আসামি গোলাম মোস্তফার নাম উল্লেখ করে মামলাটি দায়ের করেন। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে আসামিদের কাছ থেকে অবৈধ লাভ না পেয়ে ১৭ জনকে আসামি করে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে প্রতীয়মান যে, উপরোক্ত মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত। দরখাস্তকারী আসামিরা সুপরিচিত এবং স্থানীয় বাসিন্দা বিধায় শুধুমাত্র রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্য পুলিশ অতি উৎসাহিত হয়ে দরখাস্তকারী আসামির নামে মিথ্যা বানোয়াট মামলা দায়ের করে। মামলায় ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারায় মোট ১৪ জন সাক্ষী জবানবন্দি প্রদান করেন। ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ ধারায় জবানবন্দি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, কোনো সাক্ষী সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন নাই যে দরখাস্তকারী আসামিরা মব সৃষ্টি করে এবং কর্তব্যরত পুলিশের আইনানুগ কাজে বাধা প্রদান করার অপরাধ করেছেন। শুধুমাত্র দরখাস্তকারী আসামিরা সুপরিচিত বিধায় এবং দরখাস্তকারী আসামিদেরকে রাজনৈতিক ভাবে হয়রানি করার জন্য উক্ত মিথ্যা, বানোয়াট, সাজানো, উদ্দেশ্যমূলক ও মনগড়া জবানবন্দি দিয়েছেন বিধায় দরখাস্তকারী আসামিরা ওই মামলার দায় হতে অব্যাহতি পাওয়ার হকদার।
অব্যাহতির আবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাদী কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নন। এক্ষেত্রে পুলিশের অতিউৎসাহিত হওয়া এবং পূর্ব পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র স্পষ্ট। যেহেতু প্রকৃতপক্ষে দরখাস্তকারী আসামি ওই মামলার ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন, সেক্ষেত্রে দরখাস্তকারী আসামিরা মামলার দায় হতে অব্যাহতি পাওয়ার হকদার। এছাড়া, আসামিরা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনীতির সঙ্গে পূর্ব থেকেই সরাসরি সম্পৃক্ত (স্থানীয় কমিটির কাগজপত্র ও প্রত্যয়নপত্র সংযুক্ত) এবং এলাকার দলীয় রাজনীতি দুর্বল করার উদ্দেশ্যে উক্ত মিথ্যা, মনগড়া তদন্ত প্রতিবেদন প্রদান করেছেন বিধায় মিথ্যা মামলায় আসামিরা অব্যাহতি পাওয়ার হকদার।
এজাহারে যা বলা হয়েছে
এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১২ মার্চ সাড়ে ১০টায় মোহাম্মদপুর থানাধীন লালমাটিয়া বি-ব্লকের এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সামনে গোলাম মোস্তফার অবস্থানের খবর পায় পুলিশ। তিনি মোহাম্মদপুর থানার একটি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে পুলিশের একটি দল সেখানে গিয়ে তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করে। এ সময় গোলাম মোস্তফা ডাক-চিৎকার করলে স্কুলের নিরাপত্তাকর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অজ্ঞাতনামা ১৫ থেকে ২০ জন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশ সদস্যদের চারদিক থেকে ঘিরে মানবঢাল তৈরি করে এবং গোলাম মোস্তফাকে পুলিশের হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
এজাহার থেকে আরও জানা গেছে, পুলিশ সদস্যরা গোলাম মোস্তফাকে আটক করার চেষ্টা করলে আসামিরা তাদের টানাহেঁচড়া করে এবং এলোপাতাড়ি মারধর করেন। এতে পুলিশ সদস্যরা আহত হন। একপর্যায়ে গোলাম মোস্তফাকে পুলিশের হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে মারধরে আহত এক পুলিশ সদস্যকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করে তাদের নির্দেশে মোহাম্মদপুর থানায় এজাহার দায়ের করা হয়। এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৮৬, ৩৩২, ৩৫৩, ২২৫-খ, ১১৪ ও ৩৪ ধারায় মামলা দায়ের করে পুলিশ।

শুভ্র সিনহা রায়