শ্বশুর বাড়ি থেকে পুলিশ কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার, পুলিশ হেফাজতে স্ত্রী-শ্বশুর
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি গ্রাম থেকে বিএম মাহমুদুল ইসলাম নোবেল নামের পুলিশের এক সাব-ইনস্পেক্টরের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার (২৪ জুলাই) সকালে শ্বশুরবাড়ির সামনে একটি পুকুরের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত ওই পুলিশ সদস্য খাগড়াছড়ির মহালছড়ি এপিবিএন এ কর্মরত ছিলেন। সে সদর উপজেলার বিজয়পাশা গ্রামের মৃত হায়দার ভুঁইয়ার ছেলে।
পুলিশ জানায়, গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) সরকারি কাজে গোপালগঞ্জে আসেন মাহমুদুল। কাজ শেষে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে উঠেন। গতকাল সোমবার সকালের দিকে পাইককান্দি পূর্বপাড়া গ্রামে শ্বশুর ঝুনু শেখের বাড়ির পাশের একটি পুকুরপাড়ে স্থানীয় কয়েকজন শিশু প্রথম ওই পুলিশ কর্মকর্তার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে। পরে খবর পেয়ে নিহতের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন পুকুরপাড় থেকে মরদেহটি তুলে নিয়ে রাস্তার পাশে একটি ভ্যানের ওপর রাখেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। তাৎক্ষণিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহতের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ও শশুর ঝুনু শেখকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১১ বছর আগে বিয়ের পর থেকেই ছুটিতে আসলে মাহমুদুল তার নিজের বাড়ি পার্শ্ববর্তী গ্রাম বিজয়পাশা না গিয়ে শ্বশুরবাড়িতেই অবস্থান করতেন। এদিকে নিহতের পরিবারের স্বজনদের অভিযোগ, স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে মাহমুদুল ইসলামের সাথে পারিবারিক কলহ ও ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকত। মূলত স্ত্রীর মানসিক চাপ ও পারিবারিক জটিলতার কারণেই নিজ বাড়িতে না গিয়ে তাকে শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করতে হতো বলে দাবি তাদের। এই মৃত্যুর ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহতের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ও শ্বশুর ঝুনু শেখকে আটক করেছে পুলিশ।
নিহত পুলিশ কর্মকর্তা মাহামুদুলের আপন ভাই আশিকুজ্জামান বলেন, আমার ভাই গত শুক্রবার রাতে খাগড়াছড়ি থেকে গোপালগঞ্জ আসে। কিন্তু সে বরাবরের মতোই বাড়িতে না গিয়ে শ্বশুরবাড়িতে এসে থাকে। আজ সকালে খবর পেয়েছি আমার ভাই মারা গেছে। আমার ভাবী কখনো তাকে আমাদের বাড়িতে থাকতে দেয় না। আমার ভাবী পরকীয়ায় লিপ্ত। এজন্যই আমার ভাইকে হত্যা করে পুকুরে ফেলে দিয়েছে। আমি সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে আমার ভাইয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই।
চাচা মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বিয়ের পর থেকেই আমার ভাতিজা ও তার স্ত্রীর পরকীয়া নিয়ে অনেকবার গ্রাম্য সালিশ হয়েছে, তা আশপাশের গ্রামের সব লোকই জানে। তারপরেও ভেবেছি যাতে তাদের সংসার টিকে থাকে এজন্য আমরা তার স্ত্রীর সব আবদার মেনে নিয়েছি। এর আগে আমার ভাতিজার কাছ থেকে তার শ্বশুরবাড়ির পরিবার ১০ লাখ টাকা নেয়। বিভিন্ন সময় স্ত্রীর আবদার মেটাতে লোন করেও টাকা দিয়েছে। আজকে সকালে হঠাৎ খবর পেলাম আমার ভাতিজার লাশ তার শ্বশুরবাড়ির পাশের এক পুকুরের পাড়ে ভাসতে দেখছে লোকজন। পরে খবর পেয়ে ছুটে এসে দেখলাম আমার ভাতিজার লাশ রাস্তার পাশে পাটি বিছিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা ধারণা করছি পরিকল্পিতভাবে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে হত্যা করে ফেলে দেয়। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি।
ফুপাতো ভাই টুটুল বলেন, মাহমুদুলের নিজের বাড়ি ভালো মানের বিল্ডিং করা থাকতেও স্ত্রীর চাপের কারণে সে বাড়িতে থাকতে পারে না। বাধ্য হয়ে তাকে শ্বশুরবাড়িতে এসে থাকতে হয়। তাকে ঘুমের ওষুধ ও খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। আমরা ধারণা করছি তার স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
নিহত পুলিশ কর্মকর্তা মাহমুদুলের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা বলেন, আমার স্বামী বরাবরই খুব ভোরে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে। আজ সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি সে বিছানায় নেই। পরে দেখতে পেলাম তার মোবাইলটি বিছানায় বালিশের পাশে রয়েছে। আনুমানিক সকাল সাড়ে আটটার দিকে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থী আমার স্বামীর লাশ আমাদের বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে পুকুরে ভাসতে দেখে। পরে আমি খবর পেয়ে ছুটে গিয়ে বাড়ির পাশের আরো কয়েকজন লোকের সহযোগিতায় তার লাশ উদ্ধার করি। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে।
এ বিষয়ে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. সাখাওয়াত হোসেন সেন্টু বলেন, আমাদের একজন সাব ইন্সপেক্টর মাহমুদুল সে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি এপিবিএনে কর্মরত ছিল। আজ সকালে খবর পেয়ে সদর উপজেলার পাইককান্দি পূর্বপাড়া গ্রামে এসে আমরা তার লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়েছি। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে তার মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।

মাসুদ পারভেজ, গোপালগঞ্জ