১৮ বছরের সিফাতের কাঁধে মা ও তিন বোনের মরদেহ
মাত্র সাত বছর আগে ১২ বছর বয়সে বাবা কামাল হোসেনকে হারিয়েছিল জুনায়েদ ইসলাম সিফাত (১৮)। বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর ভেঙে পড়া সংসারের হাল ধরতে পড়াশোনার পাশাপাশি রায়পুর শহরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে কর্মচারীর কাজ নেন এই কিশোর। মা ও তিন বোনসহ পাঁচজনের অভাবের সংসারটি কোনো রকমে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এক নিমেষেই সব শেষ হয়ে গেলো। এবার একই সঙ্গে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন তার মা ও তিন বোন। পৃথিবীতে আপন বলতে আর কেউ রইল না সিফাতের।
আজ শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সেই হতভাগা সিফাতের কাঁধেই উঠল মা ও তিন বোনের মরদেহ। তবে এই লোমহর্ষক চার খুনের ঘটনার পর এক দিন পেরিয়ে গেলেও এর প্রকৃত রহস্য এখনো উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।
জানা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মায়ের সঙ্গে শেষবারের মতো নাস্তা খাওয়া নিয়ে কথা হয়েছিল সিফাতের। এরপর সকাল ১১টার দিকে হঠাৎ বাড়ি থেকে আসা একটি দুঃসংবাদে বুক কেঁপে ওঠে তার। দ্রুত রায়পুর শহরের ধানহাটা সংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীর পাড়ে থাকা ভাড়া বাসায় ছুটে গিয়ে সিফাত দেখেন পুরো ঘর রক্তে ভাসছে। সেখানে একে একে পড়ে রয়েছে মা শাহিনুর আক্তার (৩৮), বড় বোন সায়মা আক্তার (২০), মেজো বোন নাফিসা আক্তার ইকরা (১৬) ও ছোট বোন সিফা আক্তারের (৯) রক্তাক্ত ও নিথর দেহ। অভাবের সংসারে অনেক কষ্ট করে ভাইবোনদের আগলে রাখা সিফাত এখন পুরোপুরি একা। এই বর্বরোচিত ঘটনা কেন এবং কী কারণে ঘটল, সে বিষয়ে সিফাত নিজেও কোনো তথ্য দিতে পারছেন না। তবে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও আড়ালে থাকা অন্য অপরাধীদের খোঁজার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই স্থানীয় বাসিন্দাদের গণপিটুনিতে মারা যায় মূল সন্দেহভাজন অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার (২৮)। নিহতদের পূর্বপরিচিত অন্তর একই বাসার ওপরের তলায় ভাড়া থাকত। প্রধান সন্দেহভাজন ঘাতকের মৃত্যুর কারণে পুলিশ এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের মূল মোটিভ বা কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি। তবে নিহতের স্বজন ও প্রতিবেশীদের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে মূলত ডাকাতির উদ্দেশ্যই মুখ্য ছিল। কারণ হিসেবে তারা জানান, অত্যন্ত সাধারণ ও শান্ত প্রকৃতির এই পরিবারের সঙ্গে এলাকার কারও কোনো ধরনের শত্রুতা বা বিরোধ ছিল না। তবে ঘাতক অন্তর একা নাকি এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
নিহত চারজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অরূপ পাল জানান, নিহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র ও আঘাতের গুরুতর চিহ্ন রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের আগে কোনো ধরনের যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে চূড়ান্ত মেডিকেল পরীক্ষার জন্য শরীর থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং রিপোর্ট এলে বিস্তারিত জানা যাবে।
এ বিষয়ে রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া জানান, ময়নাতদন্ত শেষে নিহত মা ও তিন মেয়ের মরদেহ আইনি প্রক্রিয়া মেনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ঘটনায় নিহত শাহিনুরের একমাত্র জীবিত ছেলে সিফাত বাদী হয়ে রায়পুর থানায় একটি মামলা করেছেন। মামলার তদন্ত চলছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার মূল কারণ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কিছু বলা যাচ্ছে না।

আবুল কালাম আজাদ, লক্ষ্মীপুর