হাওরের সোনালি ধান ঘরে তোলা নিয়ে কৃষকের হতাশা
নেত্রকোনার মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা, কেন্দুয়া ও খালিয়াজুরী হাওরাঞ্চলের মাঠ ভরা সোনালি ধান। এবার ফলনও হয়েছে ভালো, তবু এসব এলাকার মানুষের চোখে এখন আর ঘুম নেই। ঘন ঘন বৃষ্টি, বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় ঘরে ধান তোলা নিয়ে দিনরাত উৎকণ্ঠায় কাটছে কৃষকদের।
সারা বছরের আশা-ভরসার বোরো ধান মাঠে পেকে দাঁড়িয়ে থাকলেও তা ঘরে তুলতে পারছে না অনেক কৃষক। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ আর শ্রমিক সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।
অন্যদিকে আবহাওয়া বিভাগের তথ্যমতে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আগাম বন্যা হতে পারে। এ কারণে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও কৃষি বিভাগ।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় প্রতিদিনই কখনো দিনে, কখনো রাতে ঝড়-বৃষ্টি কিংবা বজ্রপাত হচ্ছে। এতে হাওরের নিচু জমিতে পানি জমে অনেক ক্ষেতের ধান নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কৃষকদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক কখন যে পাহাড়ি ঢল নেমে এসে মুহূর্তেই সব ফসল তলিয়ে দেয়।
এদিকে নিচু জমিতে পানি থাকায় কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন নিয়ে ধান কাটা দূরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে, অপরদিকে ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া গেলেও তারা আবার অতিরিক্ত মজুরি দাবি করছেন। উঁচু জমিতে যেখানে মেশিন যাচ্ছে, সেখানে প্রতি বিঘায় অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। জমির ধান ঘরে তুলতে উভয় সংকটে পড়েছেন হাওরের কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে প্রায় ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় এক লাখ ৯০ হাজার ৬০ মেট্রিক টন। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
২৬ এপ্রিল পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে ৫৮ ভাগ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ। মাঠে ধান ভালো হলেও কাটতে না পারায় অনেক জমির ধান পানিতে নষ্ট হচ্ছে। খালিয়াজুরী উপজেলার পাংগাশিয়া, ফাটা, তিনবিলাসহ বিভিন্ন হাওর এলাকায় ধান কাটার মেশিন ও শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক নিজেরাই কষ্ট করে ধান কাটছেন। পরে সেই ধান পানির ওপর টেনে-হিঁচড়ে উঁচু স্থানে তুলছেন। কিন্তু শুকানোর জায়গা না থাকায় ধান মাড়াইও করতে পারছেন না তারা।
স্থানীয় কৃষক মহসিন মিয়া বলেন, ‘এত কষ্ট করে ধান কাটছি, কিন্তু রোদ নেই ধান শুকাতে পারছি না। আবার বাজারেও ধানের দাম নেই।’
বর্তমানে প্রতি মণ ধান প্রকার ভেদে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকায়।
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচের তুলনায় এই দাম খুবই কম। সামনে ধানের সরবরাহ বাড়লে দাম আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরাও। তারা বলেন, মিলারদের সীমিত চাহিদা ও বাজার ঝুঁকির কারণে বেশি দামে ধান কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
কৃষক খায়রুল আলম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় একটি মাত্র ফসল। মৌসুমের শুরুতেই জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক সব কিছুতে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছে—এখন ধান কাটার খরচ যোগ করে কোনো হিসাব মিলছে না। তার ওপর আবার ঝড়-বৃষ্টি। কী করব বুঝতে পারছি না।’
উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মুকুল থিগিদি জানান, সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কিছুটা কমেছে। তবে সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন শামীম জানান, কৃষকদের দুর্ভোগ প্রশাসনের নজরে এসেছে। সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের প্রস্তুতি চলছে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা নিশ্চিত করা গেলে বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন।
জেলার শতভাগ হাওর উপজেলা খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা, কেন্দুয়া, মদন ও মোহনগঞ্জ উপজেলায় এ বছর ৪৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাবিটা প্রকল্পের আওতায় চলতি অর্থবছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ফসল রক্ষা বাঁধের মেরামতের কাজ শুরু হয়। পাউবোর কারিগরি সহায়তায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসির) মাধ্যমে হাওরে প্রায় ১৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুবন্ত বাঁধ মেরামত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ভজন দাস, নেত্রকোনা