ভোটে প্রার্থীর হলফনামার প্রভাব কতটা?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্রর হলফনামায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদসহ ১০ ধরনের তথ্য জমা দিয়েছেন। তবে অল্প সময়ের মধ্যে এসব তথ্যের সঠিকতা যাচাই করা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে হলফনামা প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য ও ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এর প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। অনেক প্রার্থীর বার্ষিক আয়-ব্যয়ের তথ্যের সত্যতা নিয়েও জনমনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
হলফনামায় দেওয়া প্রার্থীদের সম্পদের তথ্য যাচাই করতে নির্বাচন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি আরও সময় নিয়ে মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
আদালতের রায়ের আলোকে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। তখন হলফনামায় প্রার্থীর বয়স, পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আয়, সম্পদ, মামলাসহ আট ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল।
এবার প্রার্থীদের আয়করের সর্বশেষ তথ্য ও নির্ভরশীলদের পেশার তালিকাসহ ১০ ধরনের তথ্য দিতে হচ্ছে। এছাড়া সম্পদের তথ্যে বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব উল্লেখ করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর হলফনামাগুলো নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন।
কোন প্রার্থীর কত সম্পদ হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নগদ ও ব্যাংকে জমা আছে ৩১ লাখ ৫৮ হাজার ৪২৮ টাকা। আয়কর রিটার্নে তিনি এক কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ১৮৫ টাকার সম্পদের হিসাব দিয়েছেন।
তারেক রহমানের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ নগদ অর্থ আছে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের। হলফনামায় জানিয়েছেন, তাঁর হাতে নগদ আছে ৬০ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৭ টাকা। আর আয়কর রিটার্নে তিনি এক কোটি ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার ৪৭৪ টাকা সম্পদের কথা উল্লেখ করেছেন।
তারেক রহমান এবং শফিকুর রহমানের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ নিয়ে কেউ কেউ ফেসবুকে সমালোচনা করেছেন। এই টাকা দিয়ে তাঁরা ভোট করবেন কীভাবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। কেউ কেউ প্রার্থীদের আয় ও সম্পদের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। হলফনামার তথ্য ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক প্রার্থীকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করারও চেষ্টা হচ্ছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দল গঠন করা এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম হলফনামায় নিজের পেশা হিসেবে ‘পরামর্শক’ উল্লেখ করেছেন। শিক্ষকতা ও পরামর্শ দিয়ে তিনি বছরে আয় করেন ১৬ লাখ টাকা। তাঁর হাতে নগদ সাড়ে ১৯ লাখ এবং ব্যাংকে তিন লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৩ টাকা রয়েছে। অন্যদিকে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহর বছরে আয় ১২ লাখ ৫৩ হাজার ৫৩৯ টাকা। তাঁর কাছে নগদ সাড়ে ১৩ লাখ টাকা আছে। আয়কর রিটার্নে সম্পদ দেখিয়েছেন ৩১ লাখ ৬৭ হাজার ৬১৯ টাকার। তিনিও পেশা হিসেবে হলফনামায় ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. গোলাম সারোয়ার তুষারের স্থাবর-অস্থাবর কোনো সম্পত্তি নেই। লেখালেখির মাধ্যমে তাঁর বছরে আয় তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা। আয়কর রিটার্নে তিনি মোট দুই লাখ ২০ হাজার টাকা সম্পদ দেখিয়েছেন।
নতুন করে রাজনীতিতে নামা হাসনাতের মতো অনেক প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদও পেশা হিসেবে ব্যবসার কথা হলফনামায় জানিয়েছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হলফনামায় তাঁর পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ব্যবসা ও পরামর্শক। এর বাইরে কৃষি, ব্যাংক মুনাফা ও সম্মানী থেকে আয় হয় তাঁর। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের হলফনামায় পেশা হিসেবে লিখেছেন ব্যবসা (চিকিৎসা)।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের হাতে নগদ আছে ৬০ লাখ ৩২ হাজার ৪০৫ টাকা এবং ব্যাংকে জামানত আছে এক লাখ ৯০ হাজার টাকা। তবে তিনি ১২ লাখ টাকা দেনায় থাকার কথা জানিয়েছেন। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরের মোট সম্পদের পরিমাণ ৮৯ লাখ ৮২ হাজার ৮৪১ টাকা। সব মিলিয়ে তাঁর বছরে আয় ২০ লাখ ৪০ হাজার ৪৮ টাকা। নুরের হাতে নগদ ২৮ লাখ ৩৮ হাজার ২১৭ টাকা এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আছে দুই লাখ ৮৯ হাজার ৩১৩ টাকা।
লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব। তাঁর স্বামী জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রবের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ সম্পদের মালিক তিনি। পেশায় ব্যবসায়ী তানিয়ার বার্ষিক আয় ৮২ লাখ ৯২ হাজার ১১ টাকা। ১৪ কোটি আট লাখ ৯ হাজার ৮৮৭ টাকার সম্পদ রয়েছে তাঁর। অন্যদিকে তাঁর স্বামী রবের বছরে আয় ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ৭৬০ টাকা; তাঁর মোট সম্পদের মূল্য এক কোটি ৬৫ লাখ ১৪ হাজার ৪০৩ টাকা।
হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর থেকেও তুলনামূলক কম প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বা রাজনীতিবিদেরা বেশি সম্পদের কথা হলফনামায় জানিয়েছেন। অনেকে একাধিক দামি গাড়িতে সারা বছর ঘুরে বেড়ালেও সেসব গাড়ি তাঁদের নামে না থাকায় হলফনামায় তা উল্লেখ করেননি।
মামলা সংক্রান্ত কারণে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, স্বাক্ষর জটিলতায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী এবং হলফনামায় নানা অসংগতি থাকায় শুক্রবার (২ জানুয়ারি) নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ বহু প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তবে সম্পদের তথ্য ভুল দেওয়ার কারণে মনোনয়নপত্র বাতিলের নজির নেই।
যা বলছেন বিশ্লেষকেরা
হলফনামায় প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য ভোটারদের মধ্যে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এবং এই ব্যবসাটা লাভজনক। নির্বাচনে দাঁড়িয়ে এমপি হয়ে ক্ষমতার অংশে পরিণত হলে অর্থবিত্তের মালিক হওয়া যায়, এটা অতীতে দেখা গিয়েছে। তাই যদি এসব তথ্য জানা যায় এবং মানুষ এই তথ্যগুলোর ভিত্তিতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, তাহলে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পায়। আমাদের যে রাজনীতিটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে সেটা থেকে আমরা উত্তরণ ঘটাতে পারি। প্রার্থীরা যেসব তথ্য দিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনকে তা যাচাই-বাছাই করে দেখা দরকার।’
তবে নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে এসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল আলীম। এজন্য তিনি নির্বাচন কমিশন, এনবিআর ও দুদকের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি মনোনয়নপত্র জমার পর থেকে বাছাই প্রক্রিয়া শেষ করার সময়সীমাও বাড়ানোর কথা বলেছেন তিনি।
ডয়চে ভেলেকে আব্দুল আলীম বলেন, ‘হলফনামার মাধ্যমে ভোটারদের কাকে ভোট দেবেন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। কিন্তু হলফনামার তথ্য ভোটারদের জানানোর ভালো কোনো পদ্ধতি নেই। কাজেই ভোটারেরা হলফনামার তথ্য দেখে যে চিন্তা করে ভোট দেবেন, তা হচ্ছে না। হলফনামাতেও কিছুটা অসংগতি আছে।’
আব্দুল আলীম বলেন, সংস্কার কমিশন থেকে প্রস্তাব করা হয়েছিল— প্রত্যেক প্রার্থী পাঁচ বছরের আয়কর নথি জমা দেবেন। পাঁচ বছরের আয়ের তথ্য জমা দিলে সেখান থেকে মানুষ তাঁর আয়ের একটি চিত্র পাবে। তখন বুঝতে পারবে প্রার্থীর সম্পদ কোথা থেকে এসেছে। কিন্তু আইনি দুর্বলতায় এটি করা যায়নি। কাজেই প্রার্থীকে চিনে, জেনে ও বুঝে ভোট দেওয়া ভোটারদের কাছে সুদূর পরাহত।
অল্প সময়ের মধ্যে প্রার্থীদের সম্পদের হিসাব যাচাই করা কঠিন উল্লেখ করে আব্দুল আলীম বলেন, প্রকৃত তথ্য জানালে ভোটারদের মধ্যে প্রভাব পড়বে। তবে সমস্যা হলো প্রতীক দেখে ভোট দেওয়া। এখন জোট করলেও যার যার প্রতীকে ভোট করতে হবে। আগে কোনো দলে যোগ দেওয়ার তিন বছর পর ওই দল থেকে প্রার্থী হওয়া যেত। এখন মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগ মুহূর্তেও যে কোনো সময় দলে যোগ দিয়ে ওই দল থেকে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রয়েছে; এটি আইনের দুর্বলতা।

ডয়চে ভেলে