ইউরোপজুড়ে এয়ারলাইন্সগুলোতে ফের বোমা হামলার হুমকি
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উড়োজাহাজ চলাচল কর্তৃপক্ষ ও এয়ারলাইন্সগুলো জানিয়েছে, টানা তৃতীয় দিনের মতো ইউরোপজুড়ে প্রায় ২০টি বাণিজ্যিক বিমান ভুয়া বোমা হামলার হুমকির মুখে পড়েছে। হুমকির কারণে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ইতালি, ফ্রান্স এবং বুলগেরিয়ার বেশকিছু যুদ্ধবিমান জরুরি ভিত্তিতে আকাশে উড়ানো হয় বেসামরিক বিমান পাহারা দেওয়ার জন্য। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
এসব হুমকির ঘটনায় কোনো উড়োজাহাজ নির্দিষ্টভাবে কোনো গোষ্ঠীর লক্ষ্য ছিল কিনা সে বিষয়ে দায় স্বীকার করা হয়নি। তবে এএফপি-র দেখা রোম ও সোফিয়া বিমানবন্দরে পাঠানো চিঠিতে বেশ কিছু নারীবিদ্বেষী বার্তা পাওয়া গেছে। এসব চিঠিতে হুমকিদাতারা নিজেদের ‘পুরুষতান্ত্রিক রাজ্যের যোদ্ধা’ হিসেবে দাবি করেছে।
এই ভুয়া বার্তাগুলোতে গ্রিস থেকে ব্রিটেনগামী উড়োজাহাজের পাশাপাশি মূলত কম খরচের ফ্লাইট এবং বুলগেরিয়া, চেক রিপাবলিক ও ইতালিগামী বা সেখান থেকে ছেড়ে আসা ফ্লাইটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
এসব ঘটনায় তিনটি উড়োজাহাজের পথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তবে প্রতিটি উড়োজাহাজই কোনো ধরনের বিস্ফোরক ছাড়াই নিরাপদে অবতরণ করেছে।
যুদ্ধবিমানের পাহারায় পথ পরিবর্তন
বোমা হামলার হুমকি পাওয়ার পর অন্তত পাঁচটি উড়োজাহাজকে বিমান বাহিনীর এসকর্ট দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
মাদ্রিদ, কোপেনহেগেন এবং লন্ডন থেকে সোফিয়াগামী রায়নাএয়ারের তিনটি উড়োজাহাজকে এসকর্ট করে বুলগেরিয়ার বিমান বাহিনী। তিনটি উড়োজাহাজেই তল্লাশি চালানো হয় এবং কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র।
প্যারিস থেকে রোমগামী এয়ার লিঙ্গাসের একটি উড়োজাহাজকে ফরাসি ফাইটার জেট এসকর্ট করে প্যারিসের ১০০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ইভ্রেক্স সামরিক ঘাঁটিতে নামতে বাধ্য করে বলে প্যারিসের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় নিশ্চিত করেছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের তরফ থেকে বলা হয়, যেহেতু পাইলট কর্তৃপক্ষের সাথে প্রত্যাশিত সহযোগিতা করেননি, তাই প্রধানমন্ত্রী অবিলম্বে যুদ্ধবিমানকে বিমানটি ইন্টারসেপ্ট করতে এবং এসকর্ট করে নিয়ে আসার নির্দেশ দেন।
ইভ্রেক্সের প্রসিকিউটর রেমি কুঁতা জানান, এয়ার লিঙ্গাসের পাইলট একপ্রকার অনীহা জানিয়ে সামরিক ঘাঁটিতে না নেমে বেসামরিক বিমানবন্দরকে প্রাধান্য দিতে চেয়েছিলেন।
এয়ারলাইন্সগুলো জানিয়েছে, লন্ডন থেকে সোফিয়াগামী রায়নাএয়ারের ফ্লাইটটির দিক পরিবর্তন করে রাজধানীর পূর্বে অবস্থিত প্লোভদিভ বিমানবন্দরে নামানো হয় এবং মিলান থেকে ওয়ারশগামী উইজ এয়ারের একটি উড়োজাহাজকে ভিয়েনায় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
হুমকির পেছনে কারা এবং কেন
সোফিয়া বিমানবন্দরের একাধিক ইমেইল ঠিকানায় পাঠানো এবং এএফপি-র দেখা একটি বার্তায় বলা হয়েছিল যে, সোফিয়াগামী তিনটি রায়নাএয়ার উড়োজাহাজে ‘বিস্ফোরক ডিভাইস’ রাখা হয়েছে।
বার্তায় বলা হয়, ‘আপনারা সবাই এক অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের সহযোগী এবং এর জন্য আমরা আপনাদের ধ্বংস করতে চাই।’
এতে আরও বলা হয়, ‘আমরা, পুরুষ রাজ্যের যোদ্ধারা, আমাদের আজকের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইতিহাসে এক ছাপ রেখে যাব। আপনাদের নারীবাদী শাসনব্যবস্থা এটি সারাজীবন মনে রাখবে। আগামী ৬০ মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটবে। আজ আপনাদের আকাশ লাল রঙে পরিণত হবে।’
ইতালীয় সংবাদপত্র 'ইল করিয়েরে দেলা সেরা'ও একই ধরনের একটি টেক্সট প্রকাশ করেছে—যেখানে রোমগামী দুটি উড়োজাহাজের প্রতি সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। রোমের বিমানবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এডিআর এর কাছে এই ইমেইল পাঠানো হয়। একটি প্রাতিষ্ঠানিক উৎস এএফপি-র কাছে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
রাশিয়ায় 'মেল স্টেট' নামে একটি সুনির্দিষ্ট চরম ডানপন্থী আন্দোলন রয়েছে, তবে এই ইমেইলের সাথে তাদের সরাসরি কোনো সংযোগ আছে কিনা তা এএফপি তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।
রাশিয়ার গোপন তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী একটি বেসরকারি সংস্থা 'ইনপ্যাক্ট'-এর প্রতিষ্ঠাতা লূ ওসবোর্ন এএফপি-কে বলেন, এই গোষ্ঠীটি নাৎসি প্রতীক ব্যবহার করে এবং তাদের হাজার হাজার সদস্য রয়েছে।
২০২১ সালে রাশিয়ার আদালত এই গোষ্ঠীটিকে একটি ‘চরমপন্থী’ সংস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছিল, তবে পরবর্তীতে তারা ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন জানায়।
‘বর্তমানে তারা ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের সাথে ঠিক কতটা সম্পৃক্ত, তা আমাদের জানা নেই’, বলেন ওসবোর্ন।
প্রাগ বিমানবন্দরের মুখপাত্র ডেনিসা হেজটমানকোভা এএফপি-কে জানিয়েছেন, বেনামী ইমেইল ঠিকানা থেকে তাদের বিমানবন্দরেও হুমকি পাঠানো হয়েছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহন কমিশনার অ্যাপোস্টলোস জি জিকোস্টাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ লিখেছেন, রিপোর্ট করা এই ঘটনাগুলো একে অপরের সাথে সংযুক্ত কিনা সে বিষয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা তড়িঘড়ি হয়ে যাবে।
তবে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব 'হাইব্রিড অ্যাটাক' বা অন্তর্ঘাতমূলক হামলার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে, যা অনেক সময় রাশিয়া বা ইরানের সাথে সম্পৃক্ত।
নিরাপদে অবতরণ
বৃহস্পতিবার লক্ষ্যবস্তু করা বেশিরভাগ উড়োজাহাজই কোনো অঘটন ছাড়াই তাদের পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যে নিরাপদে অবতরণ করেছে।
এর মধ্যে রয়েছে ওয়ারশ থেকে ব্রাসেলসগামী লট পোলিশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট, মিলান থেকে বুখারেস্টগামী উইজ এয়ারের একটি ফ্লাইট এবং বেলগ্রেড থেকে বুখারেস্টগামী এয়ারসার্বিয়ার একটি ফ্লাইট।
চেক রিপাবলিকে রায়নাএয়ার, ইজি জেট এবং স্কাই এক্সপ্রেসের প্রাগগামী চারটি নির্দেশিত উড়োজাহাজও নিরাপদে নেমেছে।
ডেনিশ পুলিশ জানিয়েছে, হুমকি পাওয়া দুটি উড়োজাহাজ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কোপেনহেগেনে অবতরণ করেছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক