নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আরব দলগুলো, চাপ বাড়াচ্ছে ইসরায়েল
ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো দল বা জোট সরকার গঠন করার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার পর অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করা ছোট দলগুলোকে নিষ্ক্রিয় করার উদ্দেশ্যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন সরকার বিদেশি অর্থায়নের প্রমাণহীন অভিযোগ তুলে ইসরায়েলি আরব নেতাদের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণের দীর্ঘ ইতিহাস থাকা উগ্র-ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির এতটাই উগ্র অবস্থান নিয়েছেন যে, তিনি ইসরায়েলকে অবিলম্বে আরব দলের নেতাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ভোট গণনা শেষের দিকে পৌঁছালেও নেসেট (ইসরায়েলের পার্লামেন্ট)-এ নেতানিয়াহু বা সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট—কারোরই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
একই সাথে, দৃশ্যপটে ঘনিয়ে আসা আরেকটি বড় হুমকি হলো ইরানের সাথে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা; যেখানে পাশে রয়েছে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র, যাদের নিজেদেরও আগামী সপ্তাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত ইসরায়েলি আরব ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাড়া দেখা গেছে। তবে ফলাফল ঘোষণার পর বেন গভিরের মতো মন্ত্রীরা গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যেমন আচরণ করা হয়েছে, তেমনি ইসরায়েলের এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আচরণ করার আহ্বান জানায়। এর ফলে ইসরায়েলি আরবদের মাঝে প্রচণ্ড ক্ষোভের জন্ম হয়।
আরব দলগুলোর কাছে সম্মিলিতভাবে বিরোধী জোটকে জয়ের শেষ রেখা পার করানোর মতো পর্যাপ্ত ভোট রয়েছে; তবে গাদি আইজেনকোট এতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছেন, কারণ নেতানিয়াহু তার ডানপন্থি ইহুদি সমর্থকদের সতর্ক করে অনবরত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বলছেন যে, বিরোধীদের ভোট দিলে আরবরা ক্ষমতায় চলে আসবে।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান এবং রক্ষণশীল ভাবধারার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নোয়াম সোহলবার্গ প্রধান আরব দল 'রাআম' -এর বিরুদ্ধে কাতারের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা 'শিন বেইত'-কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গ্যাসসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশ কাতার দীর্ঘদিন ধরে হামাসের সঙ্গে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি দাবি করেছে, ‘রাআমগেট’ কেলেঙ্কারি একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্প এবং ইসরায়েলের নির্বাচন চুরি হয়ে গেছে।
তবে সরকারি কর্মকর্তারা এসব অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
নেতানিয়াহু নিজেও দীর্ঘদিন ধরে কাতারের সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্নীতির ছায়াতলে রয়েছেন; গত বছর কাতারের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগে তার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আশায় বছরের পর বছর ধরে হামাস-শাসিত গাজায় কাতারের অর্থায়নের পক্ষে নীরব সমর্থন দিয়ে আসছিলেন।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর নেতানিয়াহুর নজরদারির মাঝেই হামাস ইসরায়েলের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী একক হামলা চালালে সেই সমীকরণ ভেস্তে যায়।
নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নেওয়া দলগুলো এখন চাপের মুখে
প্রায় ৯৩ শতাংশ ভোট গণনা শেষে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসনে এবং আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮টি আসনে এগিয়ে রয়েছে—উভয় পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের বেশ নিচে।
অন্যদিকে, দুটি প্রধান আরব জোট যৌথভাবে নজিরবিহীন ১৯টি আসন জয়ের পথে রয়েছে।
কিছু পর্যবেক্ষক মতামত প্রকাশ করেছেন যে, এই দুর্নীতির অভিযোগগুলো মূলত নেতানিয়াহুকে সুবিধা করে দেবে; কারণ এর ফলে আরব আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে জোট গড়া আইজেনকোটের জন্য রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বামপন্থি আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ 'জয়েন্ট লিস্ট'-এর প্রধান ইউসেফ জাবারিন বুধবার এএফপি-কে জানান, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তিনি বিরোধীদের সহযোগিতার নির্দেশ দিতে প্রস্তুত, তবে সরাসরি কোনো সরকারে যোগ না দিয়ে।
ইউসেফ জাবারিন বলেন, তাদের মূল অগ্রাধিকার হলো নেতানিয়াহুর রক্তে রঞ্জিত সরকারের অবসান ঘটানো; তবে তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে, ৭ অক্টোবরের হামলার পর নেতানিয়াহুর নির্দেশিত গাজা ধ্বংসযজ্ঞকে সমর্থনকারী আইজেনকোটের সঙ্গে আরব নেতাদের বহু নীতিগত মতপার্থক্য রয়েছে।
নতুন এই অভিযোগের জবাবে আইজেনকোট জানান, তিনি সার্বিক পরিস্থিতির আপডেট নিচ্ছেন এবং নির্বাচনে অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
আইজেনকোট আরও বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক মহলকে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ২৬তম নেসেটের শপথ গ্রহণের সময়সীমাকে প্রভাবিত করতে দেব না।’
আইজেনকোটের ডানঘেঁষা মিত্রদের একজন, অবিগডোর লিবারম্যান, এই অভিযোগগুলোকে নাটকীয় ও নজিরবিহীন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
ইসরায়েলি পুলিশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও সততা সংক্রান্ত প্রতিটি অভিযোগই তারা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখবে।
বারবার টিকে গেছেন নেতানিয়াহু
১৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে কখনো কখনো বিরতিহীন ও বিরতিসহ ইসরায়েল শাসন করা নেতানিয়াহু রাজনীতিতে এক ধূর্ত চতুর পরিচালক হিসেবে পরিচিত।
মঙ্গলবারও নেতানিয়াহু নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলার চেষ্টা করেছিলেন; তিনি দাবি করেন, আরব দলগুলো নগদ অর্থের খামসহ হাতেনাতে ধরা পড়েছে এবং এর জবাবে তার অনুসারীদের বিপুল সংখ্যায় ভোট দিতে বের হওয়ার আহ্বান জানান।
পুলিশ জানিয়েছে তারা তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে, তবে নির্বাচন কমিশন এটিকে স্থানীয় একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
সরকার গঠনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে এমন আরেকটি মূল কারণ হলো ইরানের ওপর সম্ভাব্য আক্রমণ।
নেতানিয়াহু বারবার ইরানে হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন এবং তার মিত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আগামী মঙ্গলবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই তিনি আক্রমণ চালাতে প্রস্তুত। আসন্ন এই নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির আসন হারানোর পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
আইজেনকোট সামরিক বাহিনীকে সতর্ক করে বলেছেন, নেতানিয়াহুর কোনো প্রশাসনিক জনমত বা নির্দেশনার অধিকার নেই এবং কর্মকর্তাদের তার রাজনৈতিক স্বার্থে সাড়া দেওয়া উচিত নয়।
তবে যুদ্ধ শুরু হলে আইজেনকোটের ওপর এক জরুরি জাতীয় ঐক্যের সরকারে যোগ দেওয়ার চাপ আরও বাড়তে পারে—যা তিনি প্রকাশ্যে ইতোমধ্যেই খারিজ করে দিয়েছেন। এছাড়া ইসরায়েলে পুনরায় নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ চলতে পারে।
ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগ চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর সিদ্ধান্ত নেবেন কাকে প্রথম সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব দেওয়া হবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক