সৌদিতে হুথিদের নতুন হামলা, সামরিক সহায়তার প্রস্তাব ফ্রান্সের
সৌদি আরব গতকাল বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) হুথিদের ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এর আগে মক্কাসহ দেশটির কয়েকটি অঞ্চলে সতর্কতা জারি করা হয়। একই সময়ে সৌদির গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা ইয়ানবু সুরক্ষায় ‘সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল’ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
এদিকে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী ও রিয়াদ-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছে বলে এএফপিকে দেওয়া সাতটি পৃথক সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে।
গত জুলাই মাস থেকে হুথিদের হামলা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ওই সময় কয়েক বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়। এর ফলে ইয়েমেনও মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
এরপর থেকে হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে অবরোধ আরোপ করেছে। তারা সৌদি তেলবাহী জাহাজ ও ভূখণ্ডে হামলা চালানোর পাশাপাশি ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করেছে। সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য এই উপকূল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হুথিদের এই অগ্রগতি উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথে ইরান ও তার মিত্রদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করেছে। এসব নৌপথ দিয়ে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য বিশ্ববাজারে পাঠায়।
২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেন সরকারের সমর্থনে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তারা ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র তাইফ ও ইয়ানবুতে হামলার উদ্দেশ্যে ছোড়া হয়েছিল বলে জোটের দাবি।
জোটের মুখপাত্র তুরকি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ‘সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়ার উসকানি ও লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ একাধিক সতর্কতা জারি করে। এর মধ্যে মক্কার জন্যও সতর্কতা ছিল। এছাড়া লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু, পাশাপাশি তাইফ, জেদ্দা ও তাবুক অঞ্চলের জন্যও সতর্কতা জারি করা হয়।
কয়েক মিনিট পর এসব সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হুথিদের হামলার আগে প্রায়ই এ ধরনের সতর্কতা জারি হতে দেখা গেছে।
ইরানের অস্বীকার
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বৃহস্পতিবার হুথিদের সামরিক পরিকল্পনায় তেহরানের সরাসরি নির্দেশনার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ফক্স নিউজের সম্প্রচারিত এক প্রতিবেদনে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, হুথিরা তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য নিজেরাই দায়ী। আঞ্চলিক প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর মতো তারাও যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, তার ভিত্তিতে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইরানের কাছ থেকে নির্দেশনা নেয় না।
ইয়ানবু সুরক্ষায় ফ্রান্সের সহায়তা
সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়তে থাকায় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানান, ইয়ানবুকে সুরক্ষিত রাখতে ফ্রান্স ‘সামরিক সক্ষমতা’ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে সেনা, রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকবে।
ইয়ানবু ও এর আশপাশের অবকাঠামো সৌদি আরবের বিশাল জ্বালানি স্থাপনা নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত ইয়ানবু সৌদি আরবের প্রধান অপরিশোধিত তেল রপ্তানি টার্মিনাল। পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন বা ‘পেট্রোলাইন’-এর মাধ্যমে এটি উপসাগরীয় উপকূলের তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোর সঙ্গে যুক্ত।
ইয়ানবুতে বড় ধরনের তেল সংরক্ষণাগার ও পরিশোধনাগারও রয়েছে। লোহিত সাগরের তীরে অবস্থানের কারণে ইউরোপের বাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে সৌদি আরবের জন্য এটি একটি বিকল্প রুট হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
কৌশলগত পাহাড়ি এলাকা দখলের লড়াই
গত সপ্তাহে সৌদি আরব অভিযোগ করে, হুথিরা ২০১৭ সালের পর প্রথমবারের মতো মক্কাকে লক্ষ্য করে একটি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে হুথিরা ওই অভিযোগ অস্বীকার করে।
এর কয়েক দিন পর হুথিরা সৌদি রাজধানী রিয়াদে হামলা চালায়। কয়েক বছরের মধ্যে এটি ছিল রিয়াদে তাদের প্রথম হামলা, যা সংঘাতের নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে হুথিদের হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনের ভেতরেও তীব্র লড়াই চলেছে।
উভয় পক্ষের সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১৫০ জন হুথি যোদ্ধা ও সরকারি বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মান্দাব প্রণালীর দিকে নজর রাখা পাহাড়ি এলাকা দখল নিয়ে সংঘর্ষেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। পাঁচটি সামরিক সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে এএফপি জানায়, নিহতদের মধ্যে অন্তত ৯৮ জন সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সদস্য বা সেনা। নিহতদের বেশির ভাগই হুথিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ইয়েমেনি সেনাসদস্যও রয়েছেন। পরে হুথিরা দাবি করে, তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বয়ে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। দক্ষিণ সৌদি আরবের কমান্ড সেন্টার ও অস্ত্রের গুদামগুলোকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয় বলে তারা দাবি করে। হুথিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ইয়েমেনি ও সুদানি যোদ্ধাদের পাশাপাশি সৌদি সদস্যরাও হতাহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে হুথিরা আরও দাবি করে, তারা সীমান্তের ওপারে ইয়ানবুতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর অবকাঠামো এবং রিয়াদের একটি অজ্ঞাত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, হুথি গোষ্ঠীর দুটি সূত্র জানিয়েছে, অন্যান্য সংঘর্ষে অন্তত ৫২ জন হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন।
এদিকে, কাহবুব পাহাড় এবং লাহজ ও তাইজ অঞ্চলের মধ্যবর্তী এলাকাতেও উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। বাব আল-মান্দাব প্রণালীর দিকে থাকা উঁচু পাহাড়ি এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে হুথিরা এসব এলাকায় লড়াই করছে। সদ্য দখল করা ভূখণ্ড সুরক্ষিত রাখার জন্য এই পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
জুলাইয়ে হুথি ও ইয়েমেন সরকারের মধ্যে ২০২২ সাল থেকে চলা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়। রিয়াদের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনের আকাশসীমা অমান্য করে একটি ইরানি বিমান সানায় অবতরণের অনুমতি দেওয়ার পর নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়। এরপর ধারাবাহিক হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)