‘অতিমানবীয় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যেতে পারে এআই’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের একজন শীর্ষ নিরাপত্তা গবেষক সতর্ক করে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এতো দ্রুত গতিতে অগ্রসর হচ্ছে যে, আগামী এক দশকের মধ্যে এটি সব মানুষের কর্মকাণ্ডকে নিঃশেষ করে দিতে পারে—এমন সম্ভাবনা ১০ শতাংশেরও বেশি।
ইভান হুবিঙ্গার নামের ওই গবেষক সোশ্যাল মিডিয়া ‘এক্স’-এ এক পোস্টে বলেন, বর্তমান সময়ে এআইয়ের অস্তিত্বশীল মডেলগুলোর কাছ থেকে এ সম্পর্কিত ঝুঁকি ‘কম’। তবে এআই প্রযুক্তিটি শিগগিরই নিজেকে এমন এক পর্যায়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে পারে যা মানবতার জন্য অস্তিত্বের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে তিনি ‘উদ্বিগ্ন’। খবর ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির।
বিশ্বজুড়ে এআই সংক্রান্ত ঝুঁকি মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান সংস্থা যুক্তরাজ্যের 'এআই সেফটি ইনস্টিটিউট' (এআইএসআই)-এর কাছে অ্যানথ্রোপিক তাদের সাম্প্রতিক মডেলটি হস্তান্তর করেনি—ফাইনান্সিয়াল টাইমসের এমন এক প্রতিবেদনের পর ইভান হুবিঙ্গারের এই বক্তব্য সামনে এলো।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিবিসি অ্যানথ্রোপিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ভবিষ্যতে এআই ব্যবস্থা কীভাবে মানবতার ওপর আক্রমণ চালাতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেননি হুবিঙ্গার।
জানা গেছে জেকব কক্সন নামে আরেকজনের এক্স-পোস্টের জবাবে এই মন্তব্য করেন ইভান হুবিঙ্গার। কক্সন নিজেকে একজন এআই গবেষক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, যিনি সম্প্রতি অ্যানথ্রোপিক থেকে পদত্যাগ করেছেন এবং এর আগে ওপেনএআই-তেও কাজ করতেন।
কক্সন লিখেছেন, ‘কোনো ছোটো-বড় কোম্পানিই দায়িত্বশীল আচরণ করছে না। এগুলো শিগগিরই এমন অতিমানবীয় সিস্টেমে পরিণত হবে যা যেকোনো কিছু হ্যাক করতে পারবে, রাতারাতি যেকোনো ক্ষেত্র বদলে দিতে পারবে এবং প্রচণ্ড ক্ষমতা ও সম্পদ অর্জন করে ফেলবে।’
এই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ওপেনএআই-এর সাথেও যোগাযোগ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকারের ক্যাবিনেট অফিসের একজন মুখপাত্র সর্বশেষ মডেলটি এআইএসআই-কে না দেওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি বলেছেন যে, সরকার মডেলগুলোকে আরও নিরাপদ করতে অ্যানথ্রোপিকসহ এই শিল্পের অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেশিন লার্নিংয়ের অধ্যাপক নীল লরেন্স বিবিসি রেডিও ৪-এর 'টুডে' প্রোগ্রামে বলেছেন, এই প্রতিবেদনটি বিশ্বাসযোগ্য।
নীল লরেন্স বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যেখানে এআই-কে খুব বেশি নিজেদের এবং চীনের মধ্যকার একটি প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থানের দিকে ঝুঁকছে, সেই প্রেক্ষাপটে এমন ঘটনা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। এটা হতে পারে যে মার্কিন প্রশাসন তাদের মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতা কমিয়ে দেওয়ার জন্য বলছে।’
সুপারইন্টেলিজেন্স নিয়ন্ত্রণের কোনো পরিকল্পনা নেই
ইভান হুবিঙ্গারের এই পোস্টটি ১ কোটি বারেরও বেশি দেখা হয়েছে। পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যি আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করি এআই মানবজাতির বিলুপ্তির মতো ঝুঁকি তৈরি করছে।’
ইভান হুবিঙ্গার আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি অ্যানথ্রোপিক তার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে, তবে সুপারইন্টেলিজেন্সকে মানুষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার মতো কোনো সমাধান বা পরিকল্পনা এখনো আমাদের কাছে নেই এবং আমরা সেই সঠিক পথটিতেও স্পষ্টভাবে নেই।’
ইভান হুবিঙ্গার 'এআই অ্যালাইনমেন্ট' বিভাগে কাজ করেন, যার লক্ষ্য হলো প্রযুক্তির ভেতরে মানুষের নৈতিক ধারণা ও নীতিগুলো যুক্ত করা। সহজ কথায়, প্রযুক্তিটি যেন মানুষের মূল্যবোধের সাথে সংগতি রেখে চলে—তা নিশ্চিত করা।
অনেক শীর্ষস্থানীয় গবেষক বলছেন যে, এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। চলতি গ্রীষ্মে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক কিছু ঘটনার মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয়েছে। যেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার ক্ষমতা থাকা এআই এজেন্টগুলো ইতোমধ্যে কিছু সাইবার আক্রমণ চালিয়েছে। ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক এবং মেটা—সবাই স্বীকার করেছে যে, তাদের এআই টুল ব্যবহার করে হ্যাকিংয়ের ঘটনাও ঘটেছে।
আগস্ট মাসে প্রকাশিত অ্যানথ্রোপিকের নিজস্ব নিরাপত্তা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তাদের তৈরি মডেল কোনো শক্তিশালী কাল্পনিক সংস্থার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে সিস্টেমের কারচুপি বা অপব্যবহার করবে—এমন ঝুঁকি কম।
নেরাপত্তা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অত্যন্ত সক্ষম এআই নিজেই স্বয়ংক্রিয় গবেষণা ও উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করে এমন বিপর্যয়কর ক্ষতি ডেকে আনবে—এমন ঝুঁকিও একইভাবে কম। তবে তারা বলেছে, এই মূল্যায়নে তারা আগে যতটা নিশ্চিত ছিল, এখন ‘ততটা নিশ্চিত নয়’। প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, আমরা এসব সম্ভাব্য সমস্যা তৈরি হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি।
এআই ক্ষেত্রের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বরা বহু বছর ধরেই এই প্রযুক্তির নিরাপত্তা সংক্রান্ত হুমকি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। ২০২৩ সালে ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড এবং অ্যানথ্রোপিকের প্রধানরা একইভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সেই সতর্কবার্তাগুলো আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, কারণ প্রতিষ্ঠানগুলো যে এআই নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে পারে—তার প্রমাণ মিলছে।
চলতি মাসের শুরুতে ওপেনএআই-এর প্রধান বিজ্ঞানী জ্যাকব পাচোকি এআই-এর অগ্রগতির বিষয়ে ‘চরম সতর্কতার’ আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করে বলেন, মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে আরও হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অ্যানথ্রোপিকের প্রধান ডারিও আমোদেই এবং জ্যারেড কাপলানসহ শীর্ষ ব্যক্তিরা এআই উন্নয়নকে কিছুটা ধীরগতির করার দাবি তুলেছেন।
এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ১ হাজার ৩০০ জন কর্মী তাদের স্বাক্ষরিত একটি খোলা চিঠিতে মার্কিন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন স্বয়ংক্রিয় এআই উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে সুচিন্তিতভাবে ধীর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক রক্ষাকবজ তৈরি করতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা হয়।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক