বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় লাফ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে তেল পরিবহণে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলের মূল্য চার সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।
আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ২.৩ শতাংশ (১.৯০ ডলার) বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৫.২০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম ২.৪ শতাংশ (১.৯১ ডলার) বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮০.০৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এর আগে গতকাল সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯.৬ শতাংশ বেড়েছিল, যা ২০২০ সালের মে মাসের পর একদিনে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড।
গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর এটিই তেলের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর পুনরায় নৌ-অবরোধ আরোপ করার পর উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। সোমবার রাতে টানা তৃতীয় দিনের মতো ইরানে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়ে ২০ শতাংশ ফি আদায়ের একটি প্রস্তাব দিয়েছেন ট্রাম্প।
বাজার বিশ্লেষক কেসিএম ট্রেডের প্রধান টিম ওয়াটারার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে অবরোধ আরোপ এবং ইরানের পাল্টা হামলা বাজারে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি এখনও পুরোপুরি বন্ধ না হলেও, দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে তেল সরবরাহ পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
ট্যাঙ্কারে হামলা ও পারস্য উপসাগরে উদ্বেগ
সংঘাতের মধ্যে ওমান উপসাগরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি তেল ট্যাঙ্কারে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এতে ভারতীয় এক ক্রু সদস্য নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। এই হামলার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বিগত দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। ফিলিপ নোভার বিশ্লেষক প্রিয়াঙ্কা সাচদেবা মনে করেন, হরমুজ প্রণালিতে ট্যাঙ্কার চলাচল ব্যাহত হলে তেলের দাম আরও এক বাড়তে পারে।
এদিকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হুথিরা যদি লোহিত সাগরে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে হামলা শুরু করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বড় সংকটে পড়বে।
এদিকে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের বর্তমান দামবিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করছে সরকার। সর্বশেষ ৩০ জুন ঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি জুলাই মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, জুন মাসে নির্ধারিত দরই বর্তমানে বহাল রয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের বর্তমান মূল্য অকটেন ১৪৫, পেট্রোল ১৪০, কেরোসিন ১৩৫ ও ডিজেল ১১৫ টাকা।
বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের সিংহভাগই আমদানি করে থাকে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আমদানিকৃত জ্বালানির ব্যয় মেটাতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ডলার খরচ করতে হবে, যা দেশের রিজার্ভের ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সম্প্রতি জুনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতির সুযোগে এশিয়ার শোধনাগারগুলো পর্যাপ্ত তেল মজুত করতে পেরেছে। ফলে অন্তত আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এশিয়ার বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া চীন তাদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল (ডিজেল, পেট্রোল) রপ্তানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাজারে জ্বালানির বড় ধরনের ঘাটতি হয়তো এড়ানো সম্ভব হবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক