ক্ষমা চাইলেন হাঙ্গেরির নতুন প্রধানমন্ত্রী
হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই পিটার মাগিয়ার ভিক্টর অরবানের দীর্ঘ শাসনামলে নিপীড়ন, হয়রানি ও অপমানের শিকার হওয়া মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দেশকে নতুন এক যুগে প্রবেশ করানোর আহ্বান জানান।
স্থানীয় সময় শনিবার (৯ মে) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেওয়া প্রথম ভাষণে মাগিয়ার বিশেষভাবে তাদের কথা উল্লেখ করেন, যারা অরবান ও তার দল ফিদেসের শাসনামলে বৈষম্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কথা বলায় ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। খবর গার্ডিয়ানের।
মাগিয়ার বলেন, আমি সেই সব নাগরিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং জনপরিচিত ব্যক্তিদের কাছে ক্ষমা চাইছি, যারা তাদের কণ্ঠ তুলে ধরার কারণে অপমানিত, হয়রানির শিকার বা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন। যারা দুর্বল মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, সমালোচনা করেছেন বা শুধু ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন- তাদের সবার কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
এই বক্তব্যকে অনেকেই প্রতীকী ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। কারণ অরবানের শাসনামলে সরকারবিরোধী নাগরিক সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর তদন্ত, কুৎসা প্রচার এবং প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ছিল।
সরকারবিরোধী অবস্থান নেওয়া অনেকেই আদালতের মুখোমুখি হয়েছেন। বুদাপেস্টের উদারপন্থী মেয়র গেরগেই কারাচোনি এবং পেচ শহরের এক রোমা সংগঠকের বিরুদ্ধে প্রাইড মিছিল আয়োজনের অভিযোগ আনা হয়েছিল, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইতিহাসে প্রথম ঘটনা। দেশের অন্যতম শীর্ষ অনুসন্ধানী সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও গুপ্তচরবৃত্তির মামলা করা হয়েছিল।
তবে মাগিয়ারের দল টিসজার বিপুল নির্বাচনি জয়ের পর ওই গুপ্তচরবৃত্তির মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সাংবাদিক সুরক্ষা কমিটি (সিপিজে) অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছিল।
শনিবারের ভাষণে মাগিয়ার সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা দেন। তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে বলেন, তার সরকার এমন একটি হাঙ্গেরি গড়তে চায়, যা হবে আরও স্বাধীন ও মানবিক।
মাগিয়ার বলেন, যা আমাদের একত্র করে, তা বিভক্তির চেয়ে অনেক শক্তিশালী হবে। হাঙ্গেরি হবে প্রতিটি হাঙ্গেরিয়ানের দেশ, যেখানে সবাই নিজের জায়গা খুঁজে পাবে। পরিবার, বন্ধু ও সমাজ আবার একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে পারবে।
বুদাপেস্টের ইওটভস লোরান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ভেরোনিকা কোভেসদি বলেন, এই ভাষণ হাঙ্গেরির সমাজকে দীর্ঘ রাজনৈতিক বিভাজনের ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করতে পারে।
তার ভাষায়, মানুষ শুধু অর্থনৈতিক পরিবর্তন চায় না, তারা মানসিক ও সামাজিক পরিবর্তনও চায়। মানুষ চায় সম্পর্কগুলো আবার স্বাভাবিক হোক, সমাজে নতুন আস্থার পরিবেশ তৈরি হোক।
ভেরোনিকা আরও বলেন, এটি ছিল এক ধরনের পুনর্মিলনের বার্তা, তবে অতীত ভুলে যাওয়ার আহ্বান নয়।
মাগিয়ারের ঐক্যের আহ্বান অরবানের অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে। অরবান শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রীতি ভেঙে উত্তরসূরির সঙ্গে করমর্দনও করেননি।
পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অরবান আবারও তার পুরোনো জাতীয়তাবাদী বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি লেখেন, ব্রাসেলসে যদি হাঙ্গেরির জন্য লড়াই না করা হয়, তাহলে ইউরোপীয় আমলারা আমাদের ওপর আধিপত্য করবে।
অরবান আরও বলেন, অর্থ বা রাজনৈতিক সমর্থনের বিনিময়ে জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দেওয়া ঐতিহাসিক ভুল হবে।
এদিকে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিতে থাকা মাগিয়ারকে নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচনি প্রচারণায় তিনি দুর্নীতি দমন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং অরবানের শাসনব্যবস্থাকে ইট ধরে ধরে ভেঙে ফেলার কথা বলেছিলেন।
তবে তার সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। নির্বাচনি প্রচারণায় তিনি অত্যন্ত সতর্কভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, যাতে ফিদেসপন্থী গণমাধ্যম তার বিরুদ্ধে প্রচারণার সুযোগ না পায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জনসমর্থন আদায়ের ক্ষমতা, সাংবাদিকদের কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা এবং একসময় ফিদেসের শীর্ষ পর্যায়ে থাকার কারণে মাগিয়ারের সঙ্গে তরুণ বয়সের অরবানের কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
ওয়ারশভিত্তিক সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজের বিশ্লেষক আন্দ্রেজ সাদেকি বলেন, এক অর্থে মাগিয়ার যেন ২০ বছর আগের অরবান- তবে ক্ষমতার দুর্নীতি ও ব্যর্থতার বোঝা ছাড়া।
অনেক ভোটারও স্বীকার করছেন যে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তারা পরিবর্তনের আশায় টিসজাকে ভোট দিয়েছেন।
৩৩ বছর বয়সী ভোটার আনিতা বলেন, মাগিয়ার সাধু নন, কিন্তু ফিদেসকে বিদায় নিতে হবে।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাগিয়ারের সমর্থকদের বড় অংশ জলবায়ু সংকট মোকাবিলা এবং এলজিবিটিকিউ+ অধিকার রক্ষায় আরও কার্যকর ভূমিকা দেখতে চান। ফলে নতুন সরকারের সামনে ভিন্নমুখী রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।
১৯৯০ সালের পর এই প্রথম হাঙ্গেরির সংসদে কোনো উল্লেখযোগ্য উদারপন্থী বা বামঘেঁষা দল নেই। তবুও দেশের অনেক উদারপন্থী রাজনীতিক মাগিয়ারকে সময় দিতে প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বুদাপেস্টের মেয়র গেরগেই কারাচোনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, অনেক দিন পর বুদাপেস্টে এত মানুষকে এত আনন্দিত ও মুক্ত মনে দেখলাম। এটি একটি দারুণ সূচনা।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক