‘পুশব্যাক’ ইস্যুতে যা বলল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
ভারতে অবস্থানরত অবৈধ বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসন ইস্যুর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলোকে দেখতে হবে বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আজ বৃহস্পতিবার (৭ মে) নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রনধীর জয়সওয়াল এ কথা বলেন।
রনধীর জয়সওয়াল বলেন, পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান যে মন্তব্য করেছেন, তা অবৈধ বাংলাদেশিদের ভারত থেকে ফেরত পাঠানোর মূল ইস্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত।
রনধীর জয়সওয়াল বলেন, গত কয়েক দিনে এ ধরনের মন্তব্য আমরা দেখেছি। এসব মন্তব্যকে অবৈধ বাংলাদেশিদের ভারত থেকে প্রত্যাবাসনের মূল ইস্যুর প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। এই প্রক্রিয়ার জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, বর্তমানে নাগরিকত্ব যাচাই সংক্রান্ত ২ হাজার ৮৬০টিরও বেশি মামলা বাংলাদেশের কাছে ঝুলে আছে। এর মধ্যে অনেক মামলাই পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
তার ভাষায়, আমাদের নীতি খুবই পরিষ্কার- যে কোনো বিদেশি নাগরিক যদি অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করেন, তাহলে আইন, প্রক্রিয়া এবং বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার আওতায় তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ দ্রুত নাগরিকত্ব যাচাই সম্পন্ন করবে, যাতে অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন সহজ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা যায়।
সংবাদ সম্মেলনে রনধীর জয়সওয়ালকে প্রশ্ন করা হয়েছিল খলিলুর রহমানের সেই মন্তব্য নিয়ে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গঠনের পর যদি ‘পুশব্যাক’ বা জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর ঘটনা ঘটে, তাহলে বাংলাদেশ ‘উপযুক্ত ব্যবস্থা’ নেবে।
এর আগে ‘পুশব্যাক’ নিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দাবি করেছিলেন, আসামে আটক ২০ জন বিদেশিকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে।
এই মন্তব্যের পর বাংলাদেশ সরকার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ান বাধেকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠিয়ে ভারতীয় কূটনীতিককে জানানো হয়, এ ধরনের মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এবং জনপরিসরে এমন বক্তব্য এড়িয়ে চলা উচিত।
গত ২৬ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা লিখেছিলেন, অভদ্র মানুষ নরম ভাষা বোঝে না। তাই আসাম থেকে অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দেওয়ার সময় আমরা এই কথাটিই মনে রাখি। উদাহরণ হিসেবে, গত রাতে ২০ জন অবৈধ বাংলাদেশিকে পুশব্যাক করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ ধরনের প্রকাশ্য মন্তব্য ‘উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে’ এবং প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন ইস্যুতে বাংলাদেশের চীনের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে ভারতের অবস্থানও জানতে চাওয়া হয়।
জবাবে রনধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ ৫৪টি অভিন্ন নদী ভাগাভাগি করে। পানি সংক্রান্ত সব বিষয়ে আলোচনার জন্য দুই দেশের মধ্যে কাঠামোগত দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা রয়েছে এবং নিয়মিত বৈঠকও হচ্ছে।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির আওতায় ফারাক্কা ব্যারাজে শুষ্ক মৌসুমে পানি বণ্টন হয়। তবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, শুষ্ক মৌসুমে ভারত পর্যাপ্ত পানি ছাড়ে না, যার ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চললেও এখনও চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিজেদের পানির চাহিদার কথা উল্লেখ করে এ চুক্তির বিরোধিতা করে আসছে।
২০১১ সালে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরে এলে একটি সমঝোতা চুক্তির চেষ্টা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, তিস্তার পানির ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাংলাদেশ এবং ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ ভারত পেত। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে সেই চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি।
এর আগে ১৯৮৩ সালে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতায় বাংলাদেশকে ৩৬ শতাংশ এবং ভারতকে ৩৯ শতাংশ পানি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। বাকি ২৫ শতাংশ পরবর্তী আলোচনার জন্য রাখা হয়। তবে সেই সমঝোতাও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক