রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ট্রাম্পের নতুন নিরাপত্তা কৌশলের মিল রয়েছে : মস্কো
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত নতুন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ‘বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছে মস্কো। রুশ সরকারের মতে, এটি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের প্রকাশিত ৩৩ পৃষ্ঠার নিরাপত্তা নথিতে বলা হয়েছে, ইউরোপ ‘সভ্যতাগত বিলুপ্তির’ ঝুঁকিতে রয়েছে এবং সেখানে রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। খবর বিবিসির।
নথিতে বিদেশি প্রভাব মোকাবিলা, অবৈধ অভিবাসন বন্ধ, গণঅভিবাসন প্রত্যাখ্যান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথাকথিত ‘সেন্সরশিপ চর্চা’ সমালোচনাকে অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আজ রোববার (৭ ডিসেম্বর) রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, আমরা যে পরিবর্তনগুলো দেখছি, সেগুলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা এটিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি।
তবে তিনি যোগ করেন, নথিটি আরও বিশদভাবে বিশ্লেষণের পরই চূড়ান্ত মন্তব্য করা হবে।
নতুন কৌশলপত্রে রাশিয়ার প্রতি তুলনামূলক নরম ভাষা ব্যবহারের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, এতে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মস্কোর ওপর চাপ দুর্বল হতে পারে।
নথিতে দাবি করা হয়, ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা ইইউ বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি বলা হয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে ‘কৌশলগত স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ করলে ইউরোপীয় অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে।
এতে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ইউরোপের বর্তমান নীতিপথের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
নথিতে ‘পশ্চিমা পরিচয় পুনরুদ্ধার’-এর আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, ২০ বছরের কম সময়ের মধ্যে ইউরোপ চেনার অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। এতে সতর্ক করে বলা হয়, সব ইউরোপীয় দেশের অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে থাকবে কি না, যাতে তারা নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে টিকে থাকতে পারে—তা স্পষ্ট নয়।
একই সঙ্গে নথিতে ইউরোপের ‘দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলো’-র প্রভাবের প্রশংসা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপীয় রাজনৈতিক মিত্রদের এ ধরনের ‘চেতনার পুনর্জাগরণে’ উৎসাহ দেবে।
ইইউর একাধিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক নতুন কৌশলপত্রটির সমালোচনা করেছেন। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভাডেফুল বলেন, ন্যাটো জোটে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র থাকবে। তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা আমাদের মুক্ত সমাজের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলা—বিশেষ করে জার্মানির ক্ষেত্রে—এই কৌশলের অংশ হওয়া উচিত নয়।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (ইসিএফআর) থিঙ্কট্যাংকের সহসভাপতি ও সাবেক সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ডট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এই নথির ভাষা চরম ডানপন্থারও ডান দিকে অবস্থান করছে, যা সাধারণত ক্রেমলিনের অদ্ভুত চিন্তা থেকেই শোনা যায়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জার্মানির কট্টর ডানপন্থী দল এএফডি-র ঘনিষ্ঠতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। দলটিকে জার্মান গোয়েন্দারা চরমপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ধারাবাহিকতায় নথিতে বলা হয়েছে, ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারে জড়িত সন্দেহভাজন নৌযান লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হবে। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলায় সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা সতর্ক করে বলেছেন, এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কংগ্রেসম্যান জেসন ক্রাউ একে ‘বিশ্বে আমেরিকার অবস্থানের জন্য ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেছেন। আর প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য গ্রেগরি মিকস বলেন, এই নথি যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্বের কয়েক দশকের ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ করছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক