রোবটের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে অস্ত্রোপচার, বাংলাদেশে চিকিৎসায় নতুন অধ্যায়
একসময় জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য দেশের রোগীদের পাড়ি জমাতে হতো বিদেশে। চিকিৎসার পাশাপাশি যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও স্বজনের অতিরিক্ত খরচ-সব মিলিয়ে চিকিৎসা হয়ে উঠত আরও ব্যয়বহুল ও ভোগান্তির। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই বাস্তবতায় এখন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে রোবটিক সার্জারি। চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণে রোবটের সূক্ষ্ম হাত ব্যবহার করে দেশের রোগীর শরীরে জটিল অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে।
দেশে প্রথম সফল রোবটিক সার্জারি সম্পন্ন হয় গত ৩১ আগস্ট। শুরুতে পিত্তথলি, অ্যাপেন্ডিক্স ও জরায়ুর অস্ত্রোপচার দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও এখন থাইমাস, কিডনি, কার্ডিওথোরাসিক ও ইউরোলজিক্যাল সার্জারিতেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। রাজধানীর মাদানী অ্যাভিনিউয়ের ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে ‘মেডবট তুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট’-এর মাধ্যমে এসব অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সফলভাবে রোবটিক সার্জারি তারা সম্পন্ন করেছে।
একদিনে আসেনি এই সাফল্য
ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের ভিজিটিং কনসালটেন্ট, এন্ডো-ল্যাপারোস্কপিক অ্যান্ড রোবোটিক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন এনটিভি অনলাইনকে বলেন, নতুন প্রযুক্তি দেশে প্রতিষ্ঠার পেছনে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও কঠোর অনুশীলন ছিল। গত ৩১ আগস্ট প্রথম রোবটিক কোলেসিস্টেকটমি বা পিত্তথলির অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়। তার ভাষায়, এটি একদিনের ফল নয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, চিকিৎসকদের অনুশীলন এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদনের পরই অস্ত্রোপচারে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। সরকারের অনুমতি এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর এই কার্যক্রম শুরু করা হয়।
প্রথম অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। চার সদস্যের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সার্জন দল, ইঞ্জিনিয়ারিং টিম, প্রশিক্ষিত নার্স ও জ্যেষ্ঠ অ্যানেসথেসিওলজিস্টরা পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি চীন থেকে একজন প্রক্টর এবং ভারত থেকে একজন কারিগরি প্রকৌশলী তিন দিন অবস্থান করে সহযোগিতা করেন।
এরই মধ্যে ১২টি রোবটিক সার্জারি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীন। শুরুতে পিত্তথলি, অ্যাপেন্ডিক্স ও জরায়ুর অস্ত্রোপচার দিয়ে শুরু হলেও এখন থাইমাস ও কিডনি সার্জারিও করা হচ্ছে। জটিল ও বড় ধরনের অস্ত্রোপচার এবং ক্যানসার চিকিৎসায় রোবটিক অ্যাসিস্টেড সার্জারি কার্যকর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
আসলে রোবট কি নিজেই অস্ত্রোপচার করে?
রোবটিক সার্জারি নিয়ে সাধারণ মানুষের একটি বড় প্রশ্ন-অস্ত্রোপচারটি কি রোবট নিজে করে? চিকিৎসকদের ভাষ্য, বিষয়টি এমন নয়। এখানে মূল নিয়ন্ত্রণ থাকে সার্জনের হাতে। ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের কার্ডিওথোরাসিক সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা. মোফাসসেল উদ্দিন আহমেদ জানান, সার্জন বিশেষ ‘সার্জন কনসোল’-এ বসে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে রোবটের হাত বা আর্ম পরিচালনা করেন। রোগীর শরীরে ছোট পোর্টের মাধ্যমে রোবটের আর্ম প্রবেশ করানো হয়। ফলে রোবটের হাত মূলত সার্জনের হাতেরই এক ধরনের সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করে।
এই ব্যবস্থায় চিকিৎসক শরীরের ভেতরের অংশ অনেক বড় ও স্পষ্টভাবে দেখতে পারেন। মানুষের হাত বা প্রচলিত ল্যাপারোস্কোপিক যন্ত্র যেখানে শরীরের সংকীর্ণ বা জটিল স্থানে পৌঁছাতে সমস্যায় পড়ে, রোবটিক আর্ম সেখানে সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে পারে। আশপাশের সুস্থ টিস্যু সুরক্ষিত রেখে অস্ত্রোপচার করার সুযোগও বাড়ে।
১০ থেকে ১৫ গুণ বড় করে দেখা যায় শরীরের ভেতর
ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও চিফ কনসালটেন্ট অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলীর মতে, রোবটিক সার্জারিকে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির আরও উন্নত ও পরিবর্তিত রূপ হিসেবে দেখা যায়। রোবটিক সিস্টেমে থ্রিডি ও ১০ থেকে ১৫ গুণ বড় করে শরীরের ভেতরের দৃশ্য দেখা সম্ভব। এতে মিলিমিটার পরিসরের ক্ষতিগ্রস্ত বা রোগাক্রান্ত টিস্যু শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় অংশে কাজ করা সহজ হয়। রোবটের হাতের কবজি ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরতে পারে, যা সংকীর্ণ জায়গায় সূক্ষ্ম কাজের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতে রক্তপাত ও অস্ত্রোপচারের পরের ব্যথা কম হতে পারে। রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরতে পারেন। তার দেওয়া তথ্যনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে রোগী ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে ফিরতে সক্ষম হতে পারেন।
থোরাসিক সার্জারিতেও নতুন সম্ভাবনা
রোবটিক সার্জারির ব্যবহার শুধু সাধারণ বা পেটের অস্ত্রোপচারে সীমাবদ্ধ থাকছে না। কার্ডিওথোরাসিক সার্জারিতেও এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। অধ্যাপক ডা. মোফাসসেল উদ্দিন আহমেদ এনটিভি অনলাইনকে জানান, বাংলাদেশে প্রথম রোবটিক থোরাসিক সার্জারি সম্পন্নকারী দলের অংশ হতে পেরে তারা গর্বিত। তার দাবি, ওই অস্ত্রোপচারের রোগী পরদিনই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং উল্লেখযোগ্য ব্যথা বা কষ্ট ছিল না। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিটি আন্তর্জাতিক মানের। বিশ্বজুড়ে যে ধরনের আধুনিক রোবটিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে, বাংলাদেশেও সেই প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ইউরোলজিতে কেন গুরুত্বপূর্ণ
রোবটিক সার্জারির গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র ইউরোলজি। ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের ইউরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও কনসালটেন্ট ডা. হাসিনা সাদিয়া খান জানান, জেনারেল সার্জারি, গাইনি ও কার্ডিওথোরাসিক সার্জারির পর ইউরোলজিতেও রোবটিক সার্জারি শুরু হয়েছে।
বিশেষ করে পেলভিস বা প্রোস্টেটের মতো শরীরের সংবেদনশীল ও সংকীর্ণ স্থানে অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রোস্টেট ক্যানসারের মতো অস্ত্রোপচারে অল্প জায়গায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাজ ও সেলাই করতে হয়। রোবটিক আর্মের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ সেখানে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। তার মতে, রোবটিক সার্জারিতে ল্যাপারোস্কোপির তুলনায় আরও বড় ও স্পষ্ট ৩ডি দৃশ্য পাওয়া যায়। একই সঙ্গে সংকীর্ণ স্থানে জটিল সেলাই বা পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচারেও রোবটিক আর্ম কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
বিদেশে চিকিৎসা, এবার দেশে রাখার চেষ্টা
বাংলাদেশে রোবটিক সার্জারি চালুর পেছনে অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে চিকিৎসকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে দেশের রোগীদের বিদেশমুখিতা কমানো। অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলী বলেন, আগে জটিল ও দুর্লভ অস্ত্রোপচারের জন্য অনেক রোগী থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রে যেতেন। চিকিৎসার মূল ব্যয়ের পাশাপাশি বিমানভাড়া, যাতায়াত এবং রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনের থাকা-খাওয়ার খরচও যুক্ত হতো। দেশে এই প্রযুক্তি সহজলভ্য হলে সেই বাড়তি ব্যয় ও ভোগান্তি কমানো সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীনও মনে করেন, দেশের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় হাসপাতাল, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজে রোবটিক সার্জারি ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, প্রযুক্তিটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলে খরচ কমে সাধারণ মানুষও এর সুফল পেতে পারেন।
এই চিকিৎসায় খরচ কত হতে পারে?
নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খরচের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের মেডিকেল সার্ভিসেস বিভাগের পরিচালক ডা. আজহারুল ইসলাম খান জানান, অন্যান্য বড় কর্পোরেট হাসপাতাল যা আগে বাস্তবায়ন করতে পারেনি, তা ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের চিকিৎসকদের দৃঢ় ইচ্ছা ও কমিটমেন্টের ফলেই সম্ভব হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই-রোগীরা যেন দেশের বাইরে না গিয়ে নিজ দেশেই রোবটিক সার্জারির মতো আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক চিকিৎসা, বিশ্বমানের সুবিধা এবং সঠিক ফলোআপ পান।
রোবটিক সার্জারি সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য করতে একটি বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি এনটিভি অনলাইনকে বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের প্রথম ২০টি রোবটিক সার্জারি সাধারণ প্রথাগত অপারেশনের খরচেই সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হবে। এই বাড়তি খরচ সার্জন বা হাসপাতালের নয়। আধুনিক এই সরঞ্জামের মেইনটেনেন্স বা রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা, উচ্চমানের স্টেরিলাইজেশন এবং সার্জারিতে ব্যবহৃত ‘কনজুমেবলস’ বা ব্যবহার্য উপাদান নিয়মিত পরিবর্তন করার জন্য খরচ সাধারণ সার্জারির তুলনায় প্রায় ৩ গুণ বেশি হয়। তবে অ্যাডভান্সড এই প্রযুক্তির ব্যয় বেশি হলেও, চিকিৎসকরা চেষ্টা করছেন যেন এটিকে রোগীদের সাধ্যের মধ্যে একটি সহনশীল বা সাশ্রয়ী সীমার মধ্যে রাখা সম্ভব হয়, যেন দেশের মানুষ নিজ দেশেই এই সুবিধা পেয়ে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।
সামনে কোথায় যাবে রোবটিক সার্জারি?
বাংলাদেশে রোবটিক সার্জারির যাত্রা এখনও শুরুর পর্যায়ে। কিন্তু এরই মধ্যে সাধারণ সার্জারি থেকে গাইনি, ইউরোলজি ও কার্ডিওথোরাসিক সার্জারিতে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। চিকিৎসকদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে নিউরোসার্জারি, অর্থোপেডিক সার্জারি এবং পুনর্বাসন চিকিৎসাতেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে।
অধ্যাপক ডা. রফিকুস সালেহীনের মতে, রোবটিক অ্যাসিস্টেড সার্জারি আধুনিক অস্ত্রোপচারের বর্তমান। সামনে এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও টেলি-সার্জারির সমন্বয় আরও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় রোবটিক সার্জারি নিয়েও গবেষণা চলছে।
অর্থাৎ, চিকিৎসকের হাতের দক্ষতার সঙ্গে প্রযুক্তির সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ-এই দুইয়ের সমন্বয়ে বাংলাদেশে অস্ত্রোপচারের নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, এই প্রযুক্তিকে কত দ্রুত আরও বেশি হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রে ছড়িয়ে দেওয়া যায় এবং কীভাবে সাধারণ রোগীর নাগালের মধ্যে রাখা যায়।

শাহজালাল রোহান