ফেলে রাখা ল্যাপটপেই সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, মিলছে ওয়ারেন্টি ও বিক্রয়োত্তর সেবা
বাংলাদেশে প্রযুক্তিপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কম বাজেটের মানুষের জন্য মানসম্মত কম্পিউটার ও ল্যাপটপ কেনা কঠিন হয়ে উঠছে। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে পড়ে থাকা বিপুলসংখ্যক পুরনো ল্যাপটপ-পিসি পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে এই সংকটের একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। পুরনো প্রযুক্তিপণ্য সংগ্রহ, রিফার্বিশ ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে যেমন মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ কমানো সম্ভব, অন্যদিকে ই-বর্জ্যও কমানো যায়।
এমন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে ‘এক্সচেঞ্জ করি লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রাসেল আহমেদ মনে করেন, দেশে থাকা পুরনো কম্পিউটারগুলো সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার করতে পারলে কম বাজেটের মানুষের কাছে প্রযুক্তি আরও সহজলভ্য করা সম্ভব। তাঁর মতে, বাংলাদেশে আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ লাখ পুরনো ল্যাপটপ ও পিসি রয়েছে। এসব ডিভাইসের একটি বড় অংশ পুনর্প্রস্তুত করে ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব। তার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন শাহজালাল রোহান।
এনটিভি অনলাইন: ‘এক্সচেঞ্জ করি লিমিটেড’ মূলত কী ধরনের সেবা দিচ্ছে?
রাসেল আহমেদ: ‘এক্সচেঞ্জ করি লিমিটেড’মূলত পুরনো কম্পিউটার কেনাবেচা, এক্সচেঞ্জ বা পরিবর্তন এবং কনফিগারেশন আপগ্রেডের কাজ করি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, একজন মানুষের কম্পিউটার পুরোনো হয়ে গেলে সেটি যেন ফেলে দিতে না হয়। গ্রাহক যেন পুরোনো ডিভাইসটি আমাদের কাছে দিয়ে কিছুটা অর্থ যোগ করে ভালো কনফিগারেশনের ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ নিতে পারেন।
এনটিভি অনলাইন: আপনার পড়াশোনা এবং এই ব্যবসায় আসার পেছনের পথচলাটা কেমন ছিল?
রাসেল আহমেদ: আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করি। এরপর ২০০৯ সালে ‘এক্সিকিউটিভ টেকনোলজিস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করি। প্রতিষ্ঠানটি মূলত ‘এসার’ ল্যাপটপ ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করত। সেখানে কাজ করার সময়ই ল্যাপটপভিত্তিক ব্যবসার একটি ধারণা আমার মাথায় আসে। পরে ২০১২ সালে ব্যক্তিগতভাবে নিজস্ব ব্যবসা শুরু করি। চাকরির সময়ে বিভিন্ন অফিসে গিয়ে একটি সাধারণ সমস্যা লক্ষ্য করি। প্রায় প্রতিটি অফিসেই সামান্য ত্রুটি, পুরোনো হয়ে যাওয়া বা ধীরগতির কারণে অনেক ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ পড়ে থাকতে দেখেছি। তখন মনে হলো, এসব পুরোনো কম্পিউটার সংগ্রহ করে তুলনামূলক উন্নত কনফিগারেশনের ডিভাইস সরবরাহ করা গেলে ভালো হয়। একই সঙ্গে পুরোনো ডিভাইসগুলো মেরামত করে কম বাজেটের মানুষের কাছে কম দামে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। এই ধারণা থেকেই ২০১৫ সালে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কম্পিউটার এক্সচেঞ্জ’ সেবা চালু করি।
এনটিভি অনলাইন: সেবাটি চালুর পর কেমন সাড়া পেয়েছিলেন?
রাসেল আহমেদ: ২০১৫ সালে সেবা শুরুর পর অনলাইন ও অফলাইন মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার ও ইতিবাচক সাড়া পাই। এতে আমরা অনুপ্রাণিত হই। কারণ দেখা গেল, ব্যবসাটি বাস্তবসম্মত এবং এর মাধ্যমে মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ কমানো সম্ভব। একজন গ্রাহক চার বছর ল্যাপটপ ব্যবহারের পর সেটি ফেলে না দিয়ে সামান্য টাকা যোগ করে আরেকটি ভালো ডিভাইস নিতে পারছেন। এতে তাঁর বড় ধরনের সাশ্রয় হচ্ছে।
এনটিভি অনলাইন: আপনাদের উদ্যোগ ই-বর্জ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় কীভাবে ভূমিকা রাখছে?
রাসেল আহমেদ: এটি আমাদের ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশ্বব্যাপী ই-বর্জ্য পরিবেশ ও মানবজীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সংগৃহীত কম্পিউটার বা ল্যাপটপ সহজে ফেলে দিই না। যেসব কম্পিউটার মেরামত করা সম্ভব, সেগুলো মেরামত করে কম বাজেটের গ্রাহকদের কাছে দেওয়া হয়। যেসব ডিভাইস পুরোপুরি অকেজো, সেগুলোর র্যাম, এসএসডি, হার্ডডিস্ক বা ডিসপ্লের মতো সচল যন্ত্রাংশ আলাদা করে বিক্রি করা হয়। মাদারবোর্ডের ছোট ছোট চিপ টেকনিশিয়ানদের দেওয়া হয় এবং প্লাস্টিকের বডি সংরক্ষণ করে প্লাস্টিক বা পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অর্থাৎ একদিকে মানুষের প্রযুক্তি খরচ কমাচ্ছি, অন্যদিকে ই-বর্জ্য কমিয়ে পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখছি।
এনটিভি অনলাইন: আপনাদের প্রতিষ্ঠানের যাত্রা কীভাবে শুরু হয়েছিল?
রাসেল আহমেদ: আমাদের যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে ‘সিস্টেম আই টেকনোলজিস’ নামে। তখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার, আনুষঙ্গিক পণ্য ও নেটওয়ার্কিং পণ্য বিক্রি করতাম এবং বিভিন্ন ধরনের তথ্যপ্রযুক্তি সেবা দিতাম। ২০১৫ সালে আমরা প্রথম ‘কম্পিউটার এক্সচেঞ্জ’ প্রকল্প চালু করি। এতে ব্যাপক সাড়া পাই। অনেক ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ আমাদের সংগ্রহে আসে এবং গ্রাহকরা পুরোনো ডিভাইস বদলে উন্নত কনফিগারেশনের প্রযুক্তিপণ্য নিতে থাকেন। পরে এক্সচেঞ্জ হওয়া পুরোনো কম্পিউটার ও ল্যাপটপ সহজ দামে বিক্রির প্রয়োজন দেখা দেয়। এ জন্য আমরা ‘ডিভাইস মামা’ নামে একটি অনলাইন পোর্টাল চালু করি। এর মাধ্যমে মানুষ পুরোনো কিন্তু ভালো মানের কম্পিউটার কিনতে পারেন। ২০২৪ সালে আমরা কম্পিউটার এক্সচেঞ্জ বিভাগটিকে সম্পূর্ণ আলাদা করে ‘এক্সচেঞ্জ করি লিমিটেড’ নামে স্বাধীন কোম্পানি হিসেবে গড়ে তুলি। বর্তমানে ‘এক্সচেঞ্জ করি লিমিটেড’ আমাদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মূল নাম। এর অধীনে ট্রেডমার্ক করা পোর্টাল হিসেবে কাজ করছে ‘ডিভাইস মামা’।
এনটিভি অনলাইন: ‘এক্সচেঞ্জ করি’ ও ‘ডিভাইস মামা’র কাজের মধ্যে পার্থক্য কী?
রাসেল আহমেদ: ‘এক্সচেঞ্জ করি’র মাধ্যমে আমরা সরাসরি গ্রাহকদের সঙ্গে পুরোনো ডিভাইস এক্সচেঞ্জ ও আপগ্রেডের প্রক্রিয়া পরিচালনা করি। আর সংগৃহীত ও মেরামত করা পুরোনো ডিভাইস বিক্রি করা হয় ‘ডিভাইস মামা’র মাধ্যমে। এখন এটি বেশ জনপ্রিয় একটি প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে সারা দেশের মানুষ স্বল্প বাজেটে কম্পিউটার কিনতে পারছেন। ২০১৫ সালে ‘ডিভাইস মামা’ চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল পুরোনো কম্পিউটার বাজারের প্রচলিত ধারণা বদলে দেওয়া। তখন অনেকেই পুরোনো কম্পিউটার বিক্রি করতেন, কিন্তু ওয়ারেন্টি, রিটার্ন বা নির্ভরযোগ্য বিক্রয়োত্তর সেবার সুনির্দিষ্ট নীতি ছিল না। আমরা পুরোনো কম্পিউটারের ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো ‘রিপ্লেসমেন্ট গ্যারান্টি’ সেবা চালু করি। এতে ক্রেতাদের কেনাকাটার ভয় ও দ্বিধা অনেকটাই কমে যায়।
এনটিভি অনলাইন: পুরোনো ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কী কী বিষয়ে সচেতন করছেন?
রাসেল আহমেদ: আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত সচেতনতামূলক কনটেন্ট ও ভিডিও প্রকাশ করি। পুরোনো ল্যাপটপ কেনার সময় শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। র্যাম, এসএসডি বা হার্ডডিস্ক এবং ব্যাটারির অবস্থা ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে। ডিসপ্লেতে কোনো দাগ, স্পট বা দৃশ্যমান ত্রুটি আছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। অবশ্যই নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান থেকে পুরোনো প্রযুক্তিপণ্য কেনা উচিত। যে প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট ওয়ারেন্টি নীতি ও রিপ্লেসমেন্ট গ্যারান্টি আছে, তাদের কাছ থেকে কেনা নিরাপদ। যারা শুধু পণ্য বিক্রি করেই দায়িত্ব শেষ করে এবং পরে কোনো সেবা দেয় না, তাদের এড়িয়ে চলা উচিত।
এনটিভি অনলাইন: আপনার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কাজের অভিজ্ঞতা উদ্যোক্তা জীবনে কতটা কাজে দিয়েছে?
রাসেল আহমেদ: বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিভিন্ন ক্যারিয়ারভিত্তিক ও অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কোনো আর্থিক সুবিধা ছাড়াই সেখানে কাজ করতে গিয়ে দল পরিচালনা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া তৈরি, উপকমিটি গঠন, সভার এজেন্ডা প্রস্তুত ও অনুষ্ঠান পরিচালনার মতো বিষয়গুলো বাস্তবভাবে শিখেছি। পরবর্তী সময়ে ব্যবসা ও চাকরির কর্মক্ষেত্রে দল ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় এসব অভিজ্ঞতা অনেক কাজে দিয়েছে। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়াশোনা করেছি, অর্থাৎ আমার বিষয়টি কারিগরি ছিল না। তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ ছিল। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি কম্পিউটার হার্ডওয়্যার সংযোজন ও নেটওয়ার্কিংয়ের ওপর বিভিন্ন কোর্স ও ডিপ্লোমা করেছি। একদিকে কারিগরি জ্ঞান এবং অন্যদিকে সংগঠন থেকে পাওয়া দল পরিচালনার দক্ষতার সমন্বয় আমাকে এই ব্যবসা পরিচালনায় সাহায্য করেছে।
এনটিভি অনলাইন: বাংলাদেশে পুরোনো ল্যাপটপ ও পিসির বাজার কতটা বড়? নতুন কম্পিউটার কিনতে গিয়ে মানুষ কী ধরনের সমস্যায় পড়ছে?
রাসেল আহমেদ: বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক ৭০ থেকে ৮০ লাখ পুরোনো ল্যাপটপ ও পিসি মানুষের হাতে বা সম্ভাব্য সংগ্রহে রয়েছে। এগুলো সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার ও রিফার্বিশ করা গেলে যন্ত্রাংশের দাম বাড়লেও কম বাজেটে ভালো কম্পিউটার মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। বর্তমানে দুটি প্রধান কারণে নতুন পিসি বা ল্যাপটপ কিনতে গ্রাহকদের সমস্যা হচ্ছে। প্রথমত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সার্ভার স্থাপনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় গ্রাফিক্স কার্ড, র্যাম, এসএসডিসহ বিভিন্ন সিলিকন চিপের দাম বিশ্ববাজারে বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় নতুন প্রযুক্তিপণ্যের দামও বেড়েছে।
এনটিভি অনলাইন: এই পরিস্থিতিতে পুরোনো বা ব্যবহৃত ল্যাপটপ কেনা কতটা লাভজনক?
রাসেল আহমেদ: এটি গ্রাহক ও প্রতিষ্ঠান উভয়ের জন্যই অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী। ৮০ হাজার বা এক লাখ টাকা দিয়ে একটি নতুন ল্যাপটপ কিনলে সাধারণত চার থেকে পাঁচ বছর ব্যবহার করা যায়। অথচ এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খরচে একটি ব্যবহৃত বা আগে ব্যবহৃত ল্যাপটপ কিনেও তিন থেকে চার বছর ব্যবহার করা সম্ভব। এ কারণে শুধু ব্যক্তি নয়, অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও দৈনন্দিন কাজের জন্য আগে ব্যবহৃত পিসি বা ল্যাপটপ বেছে নিচ্ছে। গ্রামের বা প্রান্তিক এলাকার যেসব মানুষ প্রাথমিক শিক্ষা, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, টাইপিং কিংবা মাইক্রোসফট অফিসের কাজ শিখতে চান, তাদের জন্য দামি নতুন ডিভাইসের প্রয়োজন নেই। আমরা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বাজেটের মধ্যেও মানসম্মত ল্যাপটপ সরবরাহ করছি। ফলে দেশের নিম্ন ও মধ্যম বাজেটের গ্রাহকদের প্রযুক্তির চাহিদা পূরণে এই উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। কোনো বড় প্রতিষ্ঠান থেকে একসঙ্গে ৫০-৬০টি পুরোনো ল্যাপটপ এক্সচেঞ্জ করলে সেগুলো সাধারণত ফেলে দেওয়ার মতো থাকে না। এগুলো বিভিন্ন প্রজন্মের ব্র্যান্ডেড ল্যাপটপ হতে পারে। বাংলাদেশে ভালো ব্র্যান্ডের একটি ল্যাপটপ ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব।
আমরা সামান্য ত্রুটি মেরামত করি। প্রয়োজনে কিবোর্ড বা ব্যাটারি পরিবর্তন করি, র্যাম বাড়িয়ে দিই এবং প্রচলিত হার্ডডিস্ক পরিবর্তন করে এসএসডি যুক্ত করি। এতে ডিভাইসের কর্মক্ষমতা ও গতি অনেকটাই ফিরে আসে। আমরা মূলত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বাজেটের একটি বড় গ্রাহক শ্রেণীকে সেবা দিচ্ছি। এতে ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের গড়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ কমে যায়। যেসব পরিবারের ল্যাপটপ কেনার সামর্থ্য ছিল না কিংবা যেসব শিক্ষার্থী ও প্রান্তিক এলাকার মানুষ নতুন দক্ষতা শেখা বা ইন্টারনেট ব্যবহারের কথা ভাবছিলেন, তাদের জন্য এটি বড় সুযোগ। আমরা শুধু ১০-১৫ হাজার টাকায় ল্যাপটপ দিচ্ছি না, নিশ্চিত বিক্রয়োত্তর সেবা ও ওয়ারেন্টিও দিচ্ছি। এর মাধ্যমে প্রযুক্তির খরচ কমানোর পাশাপাশি ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতেও ভূমিকা রাখছি। ভবিষ্যতে অন্য ইলেকট্রনিক্স পণ্য যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে কম্পিউটার বাজার অনেক বড়। এই বাজার পুরোপুরি কভার করতেই সময় লাগবে। তাই আপাতত আমরা কম্পিউটার খাতেই মনোযোগ রাখছি।
এনটিভি অনলাইন: বড় পরিসরে কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন?
রাসেল আহমেদ: অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো সংগৃহীত পণ্য প্রস্তুত করা এবং মূলধনের সীমাবদ্ধতা। পুরোনো পিসি বা ল্যাপটপ সংগ্রহ করার পর সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি করা যায় না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মেরামতের মাধ্যমে বিক্রয় উপযোগী করতে হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক ডিভাইস মজুত রাখতে হয়। এ ছাড়া বর্তমান মূলধন দিয়ে মাসে নির্দিষ্টসংখ্যক ডিভাইস নিয়ে কাজ করা সম্ভব হলেও বড় পরিসরে কাজ করা বা একাধিক পণ্য লাইনে যাওয়া সহজ নয়। ভবিষ্যতে বড় পরিসরে বিনিয়োগের সুযোগ হলে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ রিসাইক্লিং কারখানা গড়ে তুলতে চাই। সেখানে পুরোনো যন্ত্রাংশ পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পার্টস আলাদা করা এবং অকেজো অংশগুলো প্রক্রিয়াজাত করে পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা থাকবে। এটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের কাজের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে। তখন মাসে এক হাজার ডিভাইসের পরিবর্তে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার পিসি বা ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করা সম্ভব হবে।
এনটিভি অনলাইন: নতুন ল্যাপটপ বিক্রেতারা পুরোনো বা রিফার্বিশড কম্পিউটারের বাজারকে কীভাবে দেখছেন?
রাসেল আহমেদ: বাংলাদেশে নতুন ল্যাপটপ ও পিসি নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের একটি অংশ এখনো পুরোনো বা রিফার্বিশড বাজারকে অবহেলার চোখে দেখেন। কারণ তাদের ব্যবসা মূলত নতুন পণ্য আমদানির সঙ্গে জড়িত। অনেক বিক্রেতা এমন একটি বাজার ব্যবস্থা চান, যেখানে পুরোনো কম্পিউটার সহজে পাওয়া না যায়। সার্কুলার ইকোনমি হলো বারবার নতুন পণ্য উৎপাদন বা আমদানি না করে বিদ্যমান পণ্যকে পুনর্নির্মাণ, পুনর্ব্যবহার ও পুনরায় ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবহার ধরে রাখা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এই নীতি অনুসরণ করছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে প্রতিনিয়ত নতুন ডিভাইস আমদানি না করে দেশে থাকা পুরোনো ডিভাইসগুলো পুনর্প্রস্তুত করে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা পূরণ করা উচিত। সাধারণ মানুষের কাছে পুরোনো ও রিকন্ডিশন করা কম্পিউটারের গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বাড়ছে। ব্যক্তি পর্যায়ের ক্রেতা থেকে শুরু করে বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক অফিস পর্যন্ত অনেকেই পুরোনো কিন্তু ভালো মানের ডিভাইস ব্যবহার করে সফলভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এনটিভি অনলাইন: শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার ও সাধারণ ক্রেতাদের ল্যাপটপ কেনার ক্ষেত্রে আপনার মূল পরামর্শ কী?
রাসেল আহমেদ: ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কেনার সময় লোকদেখানো কনফিগারেশন না দেখে নিজের কাজের ধরন অনুযায়ী ডিভাইস কেনা উচিত। শুধু বন্ধুদের বলার জন্য উচ্চ কনফিগারেশনের দামি ল্যাপটপ কেনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। যারা ইন্টারনেট ব্রাউজিং, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড কিংবা ছোটখাটো ওয়েবভিত্তিক কাজ করেন, তাদের ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার বেশি বাজেট করার প্রয়োজন নেই। আর যারা পেশাদার গ্রাফিক্স ডিজাইন বা উচ্চ কনফিগারেশন প্রয়োজন এমন বড় সফটওয়্যার ব্যবহার করেন, শুধু তাদেরই বেশি বাজেটের বা দামি ল্যাপটপ কেনা প্রয়োজন। কনজিউমার সিরিজের তুলনায় বিজনেস সিরিজের ল্যাপটপ কেনা ভালো। যেমন—এইচপির এলিটবুক বা প্রোবুক, লেনোভোর থিংকপ্যাড এবং ডেলের ল্যাটিটিউড সিরিজ। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান পুরোনো ডিভাইসেও দীর্ঘদিন সহায়তা ও বিক্রয়োত্তর ওয়ারেন্টি দেয়, তাদের কাছ থেকে কেনা নিরাপদ।
এনটিভি অনলাইন: আপনারা কি বিদেশ থেকে পুরোনো ল্যাপটপ আমদানি করেন?
রাসেল আহমেদ: অনেকেই মনে করেন আমরা বিদেশ থেকে পুরোনো ল্যাপটপ আমদানি করে বিক্রি করি। আসলে তা নয়। আমরা প্রধানত আমদানির ওপর নির্ভরশীল নই। আমাদের বেশিরভাগ পণ্য বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবহারকারীর কাছ থেকে এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সংগ্রহ করা। আমরা দেশের ভেতর থেকেই বিপুল পরিমাণ পুরোনো ল্যাপটপ ও পিসি সংগ্রহ করি। এরপর সেগুলো মেরামত ও পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করে আবার বিক্রি করি। আমাদের ব্যবসার বড় একটি অংশ এভাবেই পরিচালিত হয়। যাদের বাজেট কম, তাদের জন্য দেশীয়ভাবে পুনর্ব্যবহার ও রিফার্বিশ করা ল্যাপটপ বেশি সাশ্রয়ী। কম খরচে একটি ডিভাইস কিনে যদি তিন থেকে চার বছর ব্যবহার করা যায়, তাহলে পুরোনো বা রিফার্বিশড ল্যাপটপ কেনায় ক্রেতার ক্ষতি নেই; বরং আর্থিক সাশ্রয় হয়। যেকোনো অফিস বা তথ্যপ্রযুক্তি কক্ষে গেলে দেখা যায়, অনেক ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ নানা জায়গায় পড়ে আছে। এগুলো সবই সম্পূর্ণ নষ্ট নয়। আমরা এসব অব্যবহৃত তথ্যপ্রযুক্তি সামগ্রী সংগ্রহ করে পুনর্প্রস্তুত বা পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করার ব্যবস্থা করছি।
এনটিভি অনলাইন: এ বিষয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতার কথা বলবেন?
রাসেল আহমেদ: আমাদের একটি দারুণ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাজেদা ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের একটি ভিডিও দেখে যোগাযোগ করেন। পরে তারা জানান, তাদের অফিসে কিছু পুরোনো ল্যাপটপ জমা হয়ে আছে, যেগুলো তারা এক্সচেঞ্জ করতে চান। ধারণা করা হয়েছিল, হয়তো ১০০টির মতো ল্যাপটপ হবে। কিন্তু চূড়ান্ত গণনায় আমরা প্রায় পৌনে ৩০০, অর্থাৎ ২৭৫টির মতো ল্যাপটপ পাই। এসব ল্যাপটপ প্রায় দুই-তিন বছর ধরে তাদের অফিসে অলস পড়ে ছিল এবং কোনো কাজে আসছিল না। আমাদের মাধ্যমে অব্যবহৃত ডিভাইসগুলো এক্সচেঞ্জ করার ফলে তারা বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পেয়েছে। এভাবেই আমরা করপোরেট ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অলস পড়ে থাকা সম্পদের পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান করছি।

শাহজালাল রোহান