যেন পাশের বাড়ির ছেলেটা...
অপূর্ণতা ঘুচে গেলে মানুষ বাঁচবে কিসে! চাওয়ার সঙ্গে পাওয়ার সমীকরণ সবসময় মেলে না বলেই এর নাম জীবন। সেই জীবনে ফুটবল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেখানে জীবন আছে, সেখানে মৃত্যু আছে। ফুটবল ভক্তরা কখনও কখনও গোপনে মৃত্যুকে বয়ে বেড়ায়। কাছাকাছি কথা বলেছিলেন ফুটবল দার্শনিক এদুয়ার্দো গালিয়ানো–প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে হারানো ম্যাচগুলোর ব্যক্তিগত সমাধি থাকে।
ভূমিকাটি নিশ্চয়ই অবাক করছে? ফুটবলে কী এমন ঘটে গেছে, যা মন ভারি করে দেওয়ার মতো? ব্রাজিল হেরেছে। সে তো এই শতাব্দীর পুরোটা জুড়েই হচ্ছে। ২০০২ এর পর বিশ্বকাপে হারিয়ে যেতে বসেছে ব্রাজিল। ভক্তরাও একেকটি ম্যাচ শেষ করেছে, বুকের ভেতর বেড়েছে সমাধির সংখ্যা। এসবের মাঝে একজন এসেছিলেন। মৃত্যুকে কবর দিতে। কিন্তু পারলেন না। নিয়তি তা হতে দিল না। নেইমার দ্য সিলভা দস সান্তোস জুনিয়র উলটো নিজেই হয়ে পড়েছেন মৃতপ্রায়।
নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের হার নিয়ে বিস্তর আলাপ করা যাবে। ফুটবল বোদ্ধারা প্রস্তুতও ছিলেন। কেউ কালি-কলম হাতে, কেউ মাইক্রোফোনের সামনে। হঠাৎ সব বদলে গেল। ব্রাজিলের হারে কারও যেন এতটুকু ভ্রুক্ষেপ নেই। সব গিয়ে ঠেকল একটা মানুষের কান্নায়। নেইমার কাঁদছেন। কাঁদাচ্ছেন। তাকে থামানো যাচ্ছে না। তার সঙ্গে কান্নায় শামিল হয়েছে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে বাংলার অজপাড়ার চায়ের গলি।
ফুটবলের দুই বটবৃক্ষ লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর যুগে জন্ম নিয়েও তিনি নিজে বৃক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। তাকে আদর্শ মেনেছে একটা প্রজন্ম। নেইমার এখানেই জিতে যেতে পারতেন। জিতেছেনও। আসল জয়টা এসেছে অন্যত্র। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা, রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনার প্রবল দ্বৈরথের মাঝে নেইমার এক বন্ধন তৈরি করলেন, যেখানে তাকে অপছন্দ করার সাধ্য নেই তাদের। ব্রাজিলের প্রিন্সকে আর্জেন্টাইনরাও সাদরে গ্রহণ করেছে। তাই তো, সোমবার (৬ জুলাই) সকালে নেইমারের কান্নায় চোখ ভিজেছে আর্জেন্টিনার ভক্তদেরও।
নেইমার যেন পাশের বাড়ির সেই ছেলেটা, যাকে অকারণে ভালোবাসা যায়। যার সাফল্য বলতে কিছু নেই। সে চেষ্টার কমতি রাখে না। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, সাফল্য ঠিক এখানেই। সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ সিনেমায় নায়ক অপু (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) বন্ধুকে একটা গল্প বলেন।
‘একটা ছেলে যার কল্পনাশক্তি আছে। অনুভূতি আছে। ছোটোখাটো জিনিস তাকে আনন্দ দিচ্ছে। হয়তো তার ভেতরে মহৎ একটা কিছু করার ক্ষমতা আছে। সম্ভাবনা আছে। কিন্তু করছে না। সেটিই শেষ কথা নয়। ট্র্যাজেডিও নয়। সে মহৎ কিছু করছে না। তার দারিদ্র যাচ্ছে না। অভাব মিটছে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে জীবনবিমুখ হচ্ছে না। সে পালাচ্ছে না। সে বাঁচতে চাইছে। সে বলছে বাঁচার মধ্যেই স্বার্থকতা, তার মধ্যেই আনন্দ।’
নেইমার সত্যজিতের সিনেমাটা দেখেছেন কি না, জানা নেই। কিন্তু, তার দিকে তাকালে মনে হবে, আরে সে তো এমনই। বারবার পিছিয়ে পড়ছে। দুর্দান্ত খেলে বিশ্বকে যখন তাক লাগিয়ে দিতে যাবে, ফের পিছলে পড়ছে। চোটের সঙ্গে লড়াই করে তবু বারবার ফিরে এসেছে। সে কোনোভাবেই হাল ছাড়েনি। ফুটবল বিমুখ হয়নি। ফুটবল তাকে দুহাত ভরে দেয়নি। শিরোপা অভাব, শ্রেষ্ঠত্বের অভাব, সাফল্যের শিখরে না পৌঁছানো—এ তো দারিদ্রের চেয়ে কম নয়। এতো সবের পর তিনি জাতীয় দলে ফিরেছেন, ৯৮১ দিন পর মাঠে নেমে ছাপ রেখেছেন নিজের। আনন্দ নিয়েছেন, দিয়েছেন।
সব আলো একদিন নিভে যায়। অন্ধকার টানেলে ঢুকতে হয়। বিশ্বকাপে নরওয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টিতে গোলরক্ষককে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ জানিয়ে স্কোর করার মিনিটখানেকের মাথায় কান্নায় ভেঙে পড়া। একদম সেই বাচ্চা ছেলের মতো, যার কান্না থামানোর উপায় জানেন না বন্ধুরাও।
ম্যাচের পর আবার আবেগে ভেসে যাওয়া নেইমার বললেন, ‘আমি চেষ্টা করেছিলাম, আমি সত্যিই চেষ্টা করেছিলাম। এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর আজ এখানেই আমি শেষ করলাম। সবকিছু এখন শেষ।’
প্রতিবেশি ছেলেটা পাড়া ছেড়ে চলে গেলে যেমন লাগে, প্রিয় সহকর্মী অনেকদিনের চেনা অফিস থেকে শেষবার বের হলে যেমন লাগে, ঠিক তেমন এক শূন্যতা ঘিরে ধরেছে নেইমারের এমন ঘোষণায়। যেন পাশের বাড়ির ছেলেটা চলে যাচ্ছে, দৃষ্টিসীমা থেকে বহু দূরে।

জহিরুল কাইউম ফিরোজ