মেসিকে এঁকে আলোচনায় কুষ্টিয়ার ক্রীড়াপ্রেমী শরীফুল শেখ
বিশ্বকাপ ফুটবলের আগমুহূর্তে কুষ্টিয়া জেলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বকাপের উন্মাদনা। জেলার ছয়টি উপজেলা জুড়ে ছেয়ে গেছে নীল-সাদা ও সবুজ-হলুদের পতাকায়। বাতাসে দোল খাওয়া এসব পতাকা দেখে মনে হচ্ছে, এ যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। এর মধ্যে বাড়তি আমেজ যোগ করেছে রংতুলি দিয়ে আঁকা আর্জেন্টিনার কিংবদন্তী ফুটবলার লিওলেন মেসির প্রতিকৃতি।
বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা লিওনেল মেসির প্রতি ভালোবাসা থেকে বিশাল দেয়ালজুড়ে তার প্রতিকৃতি এঁকে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার কুচিয়া মোড়া এলাকার শরীফুল শেখ। তার আঁকা ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সী মানুষ সেখানে ভিড় করছেন, ছবি তুলছেন এবং শিল্পীর সৃজনশীলতার প্রশংসা করছেন।
সরেজমিনে যেয়ে দেখা যায়, ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর এলাকার আড়কান্দি বাজারসংলগ্ন কয়েকটি দোকানের ফাঁকা দেয়ালে প্রায় ১৬ ফুট বাই ১০ ফুট জায়গাজুড়ে নিজ খরচে চারটি বড় আকারের মেসির প্রতিকৃতি এঁকেছেন শরীফুল। এর মধ্যে দুটি রঙিন এবং দুটি সাদা-কালো প্রতিকৃতি রয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহায়তা ছাড়াই শুধুমাত্র ভালোবাসা ও আবেগ থেকে তিনি এই কাজ করেছেন।
শরীফুল শেখের বাবা মৃত নুরুল ইসলাম এবং মা আকলিমা খাতুন। পেশাগতভাবে তিনি একজন কমার্শিয়াল আর্টিস্ট। পাশাপাশি ভেড়ামারার ব্রাইট ফিউচার মডেল স্কুলে চিত্রাঙ্কণ শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। চিত্রকলার পাশাপাশি তিনি লোকসংগীতের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।
শরীফুল শেখ জানান, ২০০২ সাল থেকে তিনি আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের সমর্থক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার লিওনেল মেসির প্রতি তার ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে। ২০০২ সাল থেকেই আমি আর্জেন্টিনা সমর্থন করি। পরবর্তীতে মেসির খেলা, ব্যক্তিত্ব ও সংগ্রামের গল্প আমাকে মুগ্ধ করে। তাই সুযোগ পেলেই তার ছবি আঁকার চেষ্টা করি।
শরীফুল শেখ আরও বলেন, গত বিশ্বকাপের সময়ও আমি মেসির একটি ছবি এঁকেছিলাম। এবারও সম্পূর্ণ নিজের অর্থায়নে এবং ভালো লাগা থেকেই এই কাজ করেছি। এর পেছনে কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিল না।
শরীফুলের ইচ্ছে সে সরাসরি বিশ্বকাপ খেলা দেখবে এবং মেসির সাথে দেখা করে তাকে কুষ্টিয়ার ঐতিহ্য লালনের একতারা উপহার দেবেন।
স্থানীয় আর্জেন্টিনা সমর্থক আমিরুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশই নয়, শিল্পচর্চারও একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ছবি দেখতে আসছেন এবং শিল্পীর সঙ্গে স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলছেন।
রাসেল হোসেন বলেন, গ্রামাঞ্চলে এত বড় ক্যানভাসে আন্তর্জাতিক তারকার প্রতিকৃতি খুব একটা দেখা যায় না। শরীফুল শেখের আঁকা মেসির ছবি এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।
তবে শরীফুল শেখের শিল্পীজীবন শুধু মেসির প্রতিকৃতি আঁকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি জাতীয় কবি, সাহিত্যিক, বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি এঁকে পরিচিতি লাভ করেছেন।
বিশেষ করে লালন সাঁইজির প্রতিকৃতি অঙ্কন ও শিল্পচর্চায় তার নিষ্ঠা তাকে জাতীয় পর্যায়েও পরিচিতি এনে দিয়েছে। তার প্রতিভা ও শিল্পকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে দেশের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা রিপন হোসেন বলেন, লিওনেল মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও অনুপ্রেরণার নাম। শরীফুল শেখ যে ভালোবাসা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মেসির প্রতিকৃতি এঁকেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। কোনো ধরনের আর্থিক সহযোগিতা ছাড়াই নিজের উদ্যোগে এমন শিল্পকর্ম তৈরি করা সহজ বিষয় নয়। আমরা আর্জেন্টিনা সমর্থকরা তার এই উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। এটি শুধু একজন খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে শিল্প ও সৃজনশীলতার প্রতি আগ্রহী করে তুলবে বলেও আমরা বিশ্বাস করি।
শিল্পবোদ্ধাদের মতে, গ্রামবাংলার মাটি ও মানুষের কাছ থেকে উঠে আসা এমন প্রতিভাবান শিল্পীরা যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে জাতীয় পর্যায়ে আরও বড় অবদান রাখতে পারেন। শরীফুল শেখের মতো শিল্পীরা প্রমাণ করছেন, শিল্পচর্চার জন্য বড় শহর নয়; প্রয়োজন মেধা, অধ্যবসায় ও ভালোবাসা।
রং-তুলিতে ফুটে ওঠা মেসির প্রতিকৃতি আজ শুধু একজন ফুটবলারের ছবি নয়, বরং একজন গ্রামীণ শিল্পীর স্বপ্ন, আবেগ ও সৃজনশীলতার উজ্জ্বল প্রকাশ। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার আড়কান্দি বাজারে দেয়ালজুড়ে আঁকা সেই প্রতিকৃতিগুলো এখন স্থানীয় মানুষের কৌতূহল, প্রশংসা ও গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে। শরীফুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি ২০২২ সালের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবারও মেসির হাত ধরেই শিরোপা জিতবে আর্জেন্টিনা এমনটায় প্রত্যাশা মেসি ভক্তদের।
অন্যদিকে, নান্দনিক ও ছন্দময় ফুটবলে ভর করে বিশ্বকাপ ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখছেন ব্রাজিল সমর্থকরাও। তাদের প্রত্যাশা, এবারের আসরে শিরোপা ফিরবে ব্রাজিলের ঘরে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে কুষ্টিয়াজুড়ে এখন উৎসবের আবহ। প্রিয় দলের পতাকা, দেয়ালচিত্র আর সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে ফুটবল জ্বর ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। এখন সবার অপেক্ষা মাঠের লড়াইয়ে প্রিয় দলের সাফল্য দেখা।

সাবিনা ইয়াসমিন শ্যামলী, কুষ্টিয়া