চোটের বাধা ডিঙিয়ে ইতিহাস গড়তে প্রস্তুত জাপান
তিন স্বাগতিক দেশ—কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাদ দিলে প্রথম দল হিসেবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে সূর্যোদয়ের দেশ জাপান। এশিয়ান বাছাইপর্বে প্রতিপক্ষদের খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে ‘ব্লু সামুরাই’রা।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে প্রথমবার খেলার যোগ্যতা অর্জন করার পর থেকে এটি হতে যাচ্ছে জাপানের টানা অষ্টম বিশ্বকাপ আসর। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে স্পেন এবং জার্মানির মতো দুই ফুটবল পরাশক্তিকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া জাপান এবার উত্তর আমেরিকার মাটিতে পা রাখছে নতুন রূপকথা লিখতে।
ডাগআউটের হিরোশিমা মাস্টারমাইন্ড হাজিমে মোরিইয়াসু
২০১৮ সালের জুলাই মাসে হাজিমে মোরিইয়াসু জাপানের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পান। খেলোয়াড়ি জীবনে জাতীয় দল ও সানফ্রেচে হিরোশিমার মাঝমাঠ সামলানো মোরিইয়াসু কোচ হিসেবে এই ক্লাবের হয়ে তিনটি জে-১ লিগ শিরোপাও জেতেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে জাপানকে শেষ ১৬-তে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি তাকেশি ওকাদা এবং আকিরা নিশিনোর পর তৃতীয় জাপানি কোচ হিসেবে এই কীর্তি গড়েন। তার দুর্দান্ত ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা ২০২৬ বিশ্বকাপে জাপানের মূল চালিকাশক্তি।
২০২৫ সালের ২০শে মার্চ সাইতামা স্টেডিয়ামে বাহরাইনকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে মূল পর্বের ৩টি ম্যাচ বাকি থাকতেই বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে মোরিইয়াসুর শিষ্যরা, যা জাপানের ইতিহাসের দ্রুততম সময়ে যোগ্যতা অর্জনের রেকর্ড।
২০২৬ বিশ্বকাপে জাপানের গ্রুপ ও ম্যাচ সূচি
বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে জাপানকে লড়তে হবে ইউরোপীয় ও আফ্রিকান শক্তির বিরুদ্ধে। ১৪ জুন ডালাস স্টেডিয়ামে ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে জাপান। ২০ জুন এস্তাদিও মনটেইরি স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া। ২৫ জুন ডালাসে আরেক ইউরোপের দেশ সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে গ্রুপ পর্বশেষ করবে এশিয়ান জায়ান্ট জাপান।
পজিশনভিত্তিক স্কোয়াড অ্যানালাইসিস
হাজিমে মোরিইয়াসু বর্তমানে চোটে থাকা এবং চোট থেকে সদ্য ফেরা বেশ কয়েকজন ফুটবলারকে নিয়ে বড় ঝুঁকি নিয়েছেন। তবে ব্রাইটনের চোট আক্রান্ত ফরোয়ার্ড কাউরু মিতোমা কিংবা অভিজ্ঞ তাকুমি মিনামিনোর এই দলে জায়গা হয়নি।
তরুণ প্রতিভান জিয়ন সুজুকির ওপরই পোস্টের নিচে প্রথম ভরসা রাখবে জাপান। ওসাকো ও হায়াকাওয়া ব্যাক-আপ হিসেবে দলের গভীরতা বাড়াবেন।
আয়াক্সের তাকেহিরো তোমিয়াসু এবং কো ইতাকুরা চোট থেকে সদ্য ফিরলেও ডিফেন্সের মূল কান্ডারি তারাই। সঙ্গে টানা পঞ্চম বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষায় থাকা ভেটেরান ইউতা নাগাতোমোর অন্তর্ভুক্তি রক্ষণভাগকে করছে তারুণ্য আর অভিজ্ঞতা মিশেলে ছন্দময়।
লিভারপুলের অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ও অধিনায়ক ওয়াতারু এন্দো মাঝমাঠের প্রধান ভরসা। কাতার বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনের জাল কাঁপানো রিতসু দোয়ান ও আও তানাকার সঙ্গে রিয়াল সোসিয়েদাদ তারকা তাকেফুসা কুবোর ড্রিবলিং জাপানের আক্রমণকে গতিময় করে তুলেছে।
স্কোয়াডের শক্তি ও দুর্বলতা
কাতার বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনের বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও যেভাবে ২-১ ব্যবধানে তারা জিতেছিল, সেটি প্রমাণ করে মানসিকভাবে তারা কতটা শক্তিশালী। একই সঙ্গে বাছাইপর্বে ডিফেন্সকে চীনের প্রাচীর হিসেবে প্রমাণ করেছে তারা। ৬ ম্যাচে ২৪ গোল দেওয়ার বিপরীতে একটি গোলও হজম করেনি তারা। একই সঙ্গে কুবো, দোয়ান এবং মায়েদার মতো গতিময় খেলোয়াড়েরা প্রতিপক্ষের রক্ষণকে হাই-প্রেসিংয়ে তটস্থ রাখতে ওস্তাদ।
তবে দুর্বলতাও রয়েছে জাপানের স্কোয়াডে। দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী উইঙ্গার কাউরু মিতোমার চোটের কারণে ছিটকে যাওয়া জাপানের লেফট-উইংয়ের আক্রমণের ধার অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়াও দলের তিন মূল স্তম্ভ— এন্দো, তোমিয়াসু এবং ইতাকুরা চোট থেকে ফিরে স্কোয়াডে আসায় টুর্নামেন্টের দীর্ঘ রেসে তারা কতটা ফিটনেস ধরে রাখতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের রেকর্ড বুক
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে জাপানের অভিষেক ঘটেছিল। সেবার জ্যামাইকার বিরুদ্ধে মাসাশি নাকায়ামা দেশের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি করেছিলেন।
স্মরণীয় যত রেকর্ড
সর্বোচ্চ গোলদাতা : ৪টি গোল করে জাপানের শীর্ষ গোলদাতার রেকর্ডটি এককভাবে নিজের করে রেখেছেন কিংবদন্তি কেইসুকে হোন্ডা। যিনি টানা তিন বিশ্বকাপে (২০১০, ২০১৪, ২০১৮) গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েন।
সবচেয়ে বেশি ম্যাচ : রক্ষণভাগের প্রাণ ইউতো নাগাতোমো জাপানের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৫টি ম্যাচ খেলেছেন।
সবচেয়ে বড় জয় : ২০০২ সালে তিউনিসিয়াকে ২-০ এবং ২০১০ সালে ডেনমার্ককে ৩-১ ব্যবধানে হারানো ম্যাচ দুটিই এখন পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে জাপানের সবচেয়ে বড় জয়।
রোস্তভের ট্র্যাজেডি : ২০১৮ সালে রাশিয়ার মাটিতে শেষ ১৬-র ম্যাচে শক্তিশালী বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েও শেষ মুহূর্তের কাউন্টার-অ্যাটাক গোলে ৩-২ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায়ের সেই বুকভাঙা ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসে "রোস্তভের ট্র্যাজেডি" নামে পরিচিত।
২০২৬ বিশ্বকাপে লক্ষ্য
হাজিমে মোরিইয়াসুর এই জাপান দলটির ভেতর যেকোনো পরাশক্তিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার মারণাস্ত্র রয়েছে। যা তারা কাতার বিশ্বকাপে প্রমাণ করেছে। চোট জর্জরিত স্কোয়াড নিয়ে মোরিইয়াসুর এই বাজি যদি কাজে লেগে যায়, তবে ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার মাটিতে ‘রোস্তভের ট্র্যাজেডি’ কিংবা ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারের দুঃখ ভুলে ‘ব্লু সামুরাই’রা তাদের ইতিহাসের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনাল বা তারও বেশি দূর যাওয়ার নতুন এক মহাকাব্য লিখতে পারে।
জাপানের বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলরক্ষক : জিয়ন সুজুকি, কেইসুকে ওসাকো, তোমোকি হায়াকাওয়া।
ডিফেন্ডার : ইউতা নাগাতোমো, শোগো তানিগুচি, কো ইতাকুরা, সুয়োশি ওয়াতানাবে, তাকেহিরো তোমিয়াসু, হিরোকি ইতো, আয়ুমু সেকো, ইউকিনারি সুগাওয়ারা।
মিডফিল্ডার : জুন্নোসুকে সুজুকি, ওয়াতারু এন্দো (অধিনায়ক), জুনিয়া ইতো, দাইচি কামাদা, রিতসু দোয়ান, আও তানাকা, কেইতো নাকামুরা, কাইশু সানো, তাকেফুসা কুবো, ইউইতো সুজুকি।
ফরোয়ার্ড : কোকি ওগাওয়া, দাইজেন মায়েদা, আয়াসে উয়েদা, কেন্তো শিওগাই, কেইসুকে গোটো।

স্পোর্টস ডেস্ক