জুলে রিমে থেকে বিশ্বকাপ : সোনালি ট্রফির গল্প
প্রতিটি ফুটবলারের জীবনের আরাধ্য স্বপ্ন—সোনায় বাঁধানো জ্বলজ্বল করা বিশ্বকাপ ট্রফিটা একবার উঁচিয়ে ধরা। এক ফুটবলীয় ক্যারিয়ারের সবটাজুড়ে লড়াই চলে সেই স্বপ্ন পূরণের। সব চাওয়া-পাওয়ার সমাপ্তি এই সোনালি ট্রফিটা। যা এনে দেয় অনিন্দ্য এক তৃপ্তি। এরপর ক্যারিয়ারের বাকি সব অর্জনই যেন তুচ্ছ হয়ে যায়।
সময়ের হিসেবে প্রায় এক শতক, ২২টি আসরে ৮টি দেশের উৎসব। মাঝে রূপকথার গল্পের মতোই ঘটেছে অনেক ঘটনা। বিশ্বকাপ ট্রফিটি কেবল একটি বিজয়ের স্মারক নয়, বরং এটি ত্যাগ, রোমাঞ্চ এবং কখনও কখনও ট্র্যাজেডির এক জীবন্ত ইতিহাস। সেই প্রথম বিশ্বকাপ থেকে আজ পর্যন্ত এক মহাকাব্য রচনা হয়েছে বিশ্বকাপের এই ট্রফি নিয়ে।
১৯৩০ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপের ট্রফির নাম ছিল ‘ভিক্টোরি।’ ‘ভিক্টোরি’ থেকে ‘জুলে রিমে ট্রফি’ হয়ে আরাধ্য শিরোপার আজকের নাম ‘বিশ্বকাপ ট্রফি’।
বিশ্বকাপের শুরুর দিকে চ্যাম্পিয়ন দলকে যে ট্রফি দেওয়া হতো তার নাম ছিল ভিক্টোরি। প্রথম তিন আসরের চ্যাম্পিয়নদের দেওয়া হয় এই ট্রফি। চারবারের বিশ্বচ্যম্পিয়ন ইতালির প্রথম দুই ট্রফির নাম ছিল এই ভিক্টোরি।
১৯৪৬ সালে এসে বদলে যায় ট্রফির নাম। তৎকালীন ফিফা সভাপতি জুলে রিমের সম্মানে এর নামকরণ করা হয় ‘জুলে রিমে ট্রফি।’ এই ট্রফিটির নকশা করেন ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্লেয়ার। এই ট্রফিটি ছিল গ্রিক বিজয়ের দেবী ‘নাইকি’র একটি স্বর্ণমূর্তি।
জুলে রিমে ট্রফির ভাগ্যে অন্ধকার নেমে আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ট্রফিটি নজরে পড়ে নাৎসি বাহিনীর। তাদের হাত থেকে রক্ষা করতে ‘জুলে রিমে ট্রফি’ লুকিয়ে রাখা হয় ইতালির এক ফুটবল কর্মকর্তার জুতার বাক্সের মধ্যে। সেখানে বেশ নিরাপদেই ছিল ট্রফিটি।
নাৎসি বাহিনীর নজর এড়ানো গেলেও চোরের হাত থেকে বাঁচানো যায়নি ট্রফিটিকে। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ শুরুর কয়দিন আগে ট্রফিটিকে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয় একটি সেন্টারে। কিন্তু চোখের পলকে সেখান থেকে চুরি হয়ে যায় ট্রফিটি।
বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েকদিন আগে ঘটা এই ঘটা সারা বিশ্বেই বেশ আলোচনার জন্ম দেয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছিল যে, বিশ্বকাপই হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। কারণ আর কিছুই নয়। যে ট্রফির জন্য লড়াই সেটিই তো নেই। বড় বড় গোয়েন্দা সংস্থা হাঁপিয়ে ওঠে ট্রফি খুজে পেতে। কিন্তু ফলাফল ব্যর্থ। এরপর হারানো সেই ট্রফি খুঁজে বের করেন পোষা কুকুর ‘পিকলস।’
জুলে রিমে ট্রফিটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে ১৯৮৩ সালে। ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়। ফিফার তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, ট্রফিটি একেবারে দিয়ে দেওয়া হয় ব্রাজিলকে। কিন্তু সেটি আসলে তাদের ভাগ্যে ছিল না। ১৯৮৩ সালে রিও ডি জেনিরো থেকে ট্রফিটি আবারও চুরি হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত আর খুঁজে পাওয়া যায়নি আসল সেই ট্রফিটি। ধারণা করা হয় চোরেরা ট্রফিটি গলিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে।
জুলে রিমে চুরি হওয়ার আগেই নতুন ট্রফি ডিজাইনের আহ্বান করে ফিফা। ১৯৭৪ সালে ৫৩টি নকশার মধ্যে চূড়ান্ত করা হয় বিশ্বকাপের আজকের ট্রফির ডিজাইনটি। এই নকশাটি করেছিলেন ইতালিয়ান শিল্পী সিলভিও গাজ্জানিগা।
নতুন ট্রফিটি ডিজাইন করা হয়েছে দুইজন খেলোয়াড় দুই হাত দিয়ে পুরো পৃথিবীকে আগলে রাখার ভঙ্গিমায়। ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি এই ট্রফিটির ওজন ৬.১৭৫ কেজি এবং উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার। এর গোড়ায় রয়েছে সবুজ রঙের দামী ‘ম্যালাকাইট’ পাথরের দুটি স্তর।
জুলে রিমে ট্রফি চুরি হওয়ার পর নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয় ফিফা। এরপর থেকে আর কোনো দেশকেই দেওয়া হয় না আসল ট্রফিটি। শুধুমাত্র উদযাপনের সময় মূল ট্রফিটি দেওয়া হয়। সেটিও শুধুমাত্র বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড়, কোচ ও রাষ্ট্রপ্রধানরাই এটি খালি হাতে স্পর্শ করতে পারেন। আর দেশে নিয়ে যান ব্রোঞ্জের ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া একটি ‘রেপ্লিকা’ বা অবিকল নকল ট্রফি। মূল ট্রফিটি সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার সদর দপ্তরে রাখা হয়।
তবে ১৯৭৪ সাল থেকে নতুন ট্রফিতে একটি নতুন রেওয়াজ চালু করে ফিফা। ট্রফিটির নিচের অংশে প্রতি আসরের বিজয়ীর নাম খোদাই করা থাকে। ধারণা করা হয়, ২০৩৮ সাল পর্যন্ত বিজয়ীদের নাম লেখার জায়গা রয়েছে এই ট্রফিতে। এরপর হয়তো ফিফা আবারও নতুন কোনো নকশার ট্রফি উন্মোচন করবে।
নকশা যা-ই হোক, এই সোনালি ভাস্কর্যের প্রতি ফুটবল বিশ্বের প্রেম যে চিরন্তন থাকবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

নাজমুল সাগর