বাঁকা চোখে
মজার ইশকুল, শাস্তি ও পুরস্কার
১.
প্রিয় পাঠক, আজ আমরা একটি নাটক নিয়ে আলোচনা করব।
নাটকের নাম : মজার ইশকুল, শাস্তি ও পুরস্কার
নাটকের নির্ঘণ্ট
সময় ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯ অক্টোবর। স্থান : বনশ্রী থেকে শ্রীঘর। আলোচনার বিষয়বস্তু : শিক্ষা বনাম মানবপাচার। আয়োজনে : মজার স্কুল ও পুলিশ।
(কুশীলব পর্ব)
প্রথম দৃশ্য
বনশ্রীর একটি বাসা থেকে আটক ১০ শিশু। সঙ্গে চার পাচারকারী—আরিফুর রহমান, হাসিবুল হাসান, জাকিয়া সুলতানা ও ফিরোজ আলম খান।
মিডিয়ার সামনে উপস্থাপিত তাঁরা। হাতে হাতকড়া। পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কাবস্থার পোজ।
ছবিটি মেট্রোপলিটন পুলিশের ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়। নিচে হাজার হাজার কমেন্ট। সব মিলিয়ে হট কেক।
দ্বিতীয় দৃশ্য
অপরাধীদের রিমান্ড। পরিবারের কান্না। ১০ শিশুর বক্তব্য। বাদী মনিরের ভাষ্য। পুলিশের উক্তি।
তৃতীয় দৃশ্য
মানবপাচারের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেল না। তবু কারাগারে দিনাতিপাত। বারবার জামিন নাকচ।
চতুর্থ দৃশ্য
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনার ঝড়। মিডিয়ার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হস্তক্ষেপ। জামিনে মুক্তি।
পঞ্চম দৃশ্য
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ডাক এলো। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন শিশু পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত চার তরুণ-তরুণী। পুলিশ দপ্তর থেকে ফের তলব। পুরস্কার দেওয়া হলো ওই চারজনকে। পুলিশ কমিশনারের দুঃখ প্রকাশ। খলনায়ক থেকে নায়ক চরিত্রে আবির্ভাব, এসব নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট। হাজার হাজার মন্তব্য।
(নাটক শেষ)
২
(দর্শক পর্ব)
নাট্যবিশ্লেষণ
জনাব, কর্তৃপক্ষ। আপনাদের কাছে দেশবাসীর পক্ষ থেকে কিছু প্রশ্ন। তার আগে বলে রাখি, নাটক ভালোই জমেছে। একটা সাধারণ বিষয়কে হট কেক বানিয়ে আপনারা বেশ মজা পান।
এই যে মজার ইশকুলের চার যুবককে নিয়ে যে খেলাটা খেলেছেন, তা কিন্তু আজ জাতির সামনে পরিষ্কার। কারণ, সবশেষে আপনারাই দিলেন পুরস্কার।
কিন্তু মাঝখানে এই ছেলেগুলোর যে ক্ষতি হলো তা কি আপনারা পুষিয়ে দিতে পারবেন?
এর জবাবে আপনারা বলবেন, ‘আমাদের বোকামির কারণেই তো তাঁরা আজ পুরো জাতির কাছে সম্মানিত ও অভিনন্দিত। তাঁদের কাতারে অনেকেই যোগ দেবে।’
জি হুজুর মহোদয়। আপনাদের কথার সঙ্গে আমরাও এক্কেবারে একমত। আপনারা যে নাটক সাজাতে খুব ওস্তাদ, এটা আর নতুন করে বলতে হবে না। এই তো মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে দীর্ঘ ২২ বছর কারাভোগের পর এক নির্দোষী লোককে আপনারা খালাস দিলেন। এটাও হয়েছে মিডিয়ার কল্যাণে। কিন্তু এরই মধ্যে সিলেটের ওই ফজলু মিয়ার জীবনের প্রায় অর্ধেকটাই শেষ। এত দিন পর তাঁর কাছে তো পরিবারের মানুষই অপরিচিত। বলা যেতে পারে, লোকটার পুনর্জন্ম হয়েছে। আপনারা এই পুনর্জন্মের স্রষ্টা।
এখন প্রশ্নে আসা যাক। মজার ইশকুলের এই ছেলেমেয়েরা আপনাদের আটককালীন তাঁদের কাগজপত্র দেখিয়েছিলেন। উদ্ধার হওয়া ১০টি শিশুরও তো বক্তব্য নিয়েছিলেন। আমরা এসব বক্তব্য মিডিয়ার কল্যাণে পাই টু পাই দেখতে সক্ষম হয়েছি। তার পরও আপনারা কেন তাঁদের কারাগারে পাঠালেন? কেন তাঁদের অপরাধী সাজিয়ে দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করলেন? কেন তাঁদের মা-বাবার অশ্রু ঝরালেন? কেন তাঁদের বন্ধু-বান্ধবদের ঘুম হারাম করলেন? কেন দেশবাসীর নেতিবাচক দৃষ্টিতে আপনারা পড়লেন?
আপনারা এসব প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন না। অথবা জবাব থাকলেও দেবেন না। হয়তো এসব নাটকের পেছনে থাকে কোনো অসৎ কর্মকর্তার সাময়িক বাহবা পাওয়ার লোভ বা একটি পদোন্নতি। অথবা দেশবাসীর শান্ত দৃষ্টিকে হঠাৎ একটি নাটক মঞ্চস্থের মধ্য দিয়ে অন্যদিকে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া।
আপনাদের ধন্যবাদ যে, অবশেষে এ পর্বের নাটকের প্রকৃত দৃশ্যের পর্দা উন্মোচন করেছেন। আপনাদের এ জন্যও ধন্যবাদ যে, আপনারা আটককালীন পাচারকারীদের সঙ্গে চেতনানাশক কোনো দ্রব্যাদি উপস্থাপন করেননি। তাহলে আরো কঠিন যুক্তি হতো—এসব জিনিস দিয়ে শিশুদের অচেতন করে পাচার করেন তাঁরা।
ইদানীং লোকমুখে শোনা যাচ্ছে, আপনাদের অনেকেই নাকি এসব করে। বিশেষ করে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধকে এখন আর কেউ বিশ্বাস করে না। সত্য হলেও বিশ্বাস করে না।
কারণ, হাজার অসত্যের চাপায় আজ সত্যরা পিষ্ট।
শুধু আপনাদের দোষ দিয়ে কী লাভ? আপনারাও আজ দিশেহারা। কারণ চারদিকে সেবার নামে যে ধরনের ভণ্ডামি চলছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই ক্ষুদ্রঋণ থেকে শুরু করে দাতব্য প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত। সবগুলোর সামনের দৃশ্য আর পেছনের দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যাহোক, আপনারা সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। অনুরোধ থাকবে নাটক মঞ্চস্থ না করে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরুন। অপরাধী হোক আর নাই হোক, সবই তো আমরা আমরাই। আমাদের সবাইকে নিয়ে দেশটাকে গড়তে হবে।
সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিকে নয়, সমস্যাকে চিহ্নিত করুন। সমস্যার মূলোৎপাটন করুন। দেখবেন, সোনার বাংলাদেশটা হীরায় রূপান্তর হয়েছে।
লেখক : উন্নয়নকর্মী

আহমেদ সালেহ