অভিমত
সংলাপে কি আলোর রেখা ফুটবে?
সংকট যত বড়, যত কঠিনই হোক না কেন, এমনকি মহাযুদ্ধের অবশেষে সংলাপই হয়ে দাঁড়ায় সমাধানের একমাত্র পথ। বাংলাদেশের গত অর্ধশতাব্দীর ইতিহাসে বারবার সংকটে অবতীর্ণ হয়েছে এই জাতি। জনগণ আশা করেছে, সংকট থেকে অবশেষে শান্তি অর্জিত হবে। কিন্তু সংকটের সফলতার ইতিহাস একরকম নেই বললেই চলে। একমাত্র দৃশ্যমান সফলতা ১৯৯০ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলন অবশেষে রাজনৈতিক দলের মতৈক্য। সেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক সংলাপ ছিল না। শক্তিধর সামরিক শাসকের মোকাবিলায় রাজনৈতিক ঐক্য অর্জিত হয়েছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার কায়েম হয়েছিল। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত চেতনা এবং অনুশীলন লক্ষ করা যায়নি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে দেশি-বিদেশি সংলাপের প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে। সংঘাত ও সহিংসতার মধ্যে নির্ধারিত হয়েছে জাতির ভাগ্য। সে সময়ে দুই প্রধান দলের সাধারণ সম্পাদকদের আলোচনা সফলতার প্রান্তসীমায় এসে নিষ্ফল হয়েছে। ২০১৪ সালের অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রাক্কালে সংলাপের তীব্রতা অনুভব করেছে গোটা জাতি; কিন্তু সংলাপ সফল হয়নি। কার্যকর বিরোধীদল বিএনপি বারবার সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। ক্ষমতাসীন দল বারবারই কঠোর ভাষায় সংলাপের আহ্বান নাকচ করেছে।
বরাবরই সংলাপ বা বিরোধের বিষয় ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। নির্বাচন কমিশনের প্রশ্নটি গৌণ হয়েছে সব সময়। পরিবর্তিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির কৌশল হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন কমিশনের বিষয়টি উত্থাপন করে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অতিসম্প্রতি ১৩ দফা প্রস্তাবসংবলিত নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণ প্রস্তাবনা পেশ করেন। ১৩ দফা প্রস্তাবের মূলকথা হলো, সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন। খালেদা জিয়ার ১৩ দফা প্রস্তাবনাকে তিনটি মোটাদাগে চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন; দ্বিতীয়ত, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন এবং তৃতীয়ত, আরপিও সংশোধন। তবে তারা মূল দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থেকে সরে আসেনি। শুধু ভাষাগত পরিবর্তন করে তারা এখন নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলছে। খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশন প্রশ্নে আহূত সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন।
সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যখন সংলাপকে নাকচ করে শক্ত কথাবার্তা বলছিলেন, তখন অনেকটা আকস্মিকভাবে সংলাপের আহ্বান এলো। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করেন। এসব বিরোধী দল হচ্ছে—১. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), ২. জাতীয় পার্টি, ৩. এলডিপি, ৪. জাসদ-ইনু, ৫. কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ। প্রথমেই ডাক আসে বিএনপির। ১৮ ডিসেম্বর রোববার ১০ সদস্যের বিএনপির প্রতিনিধিদল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের মুখোমুখি হন। যথারীতি বিএনপি নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে তাদের প্রস্তাবনা তুলে ধরে। বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফলাফল সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ঘণ্টাব্যাপী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তাদের সংলাপ সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের বাছাই কমিটি গঠনের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন রাষ্ট্রপতির কাছে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, খালেদা জিয়া ১০ জন সম্মানীয় ব্যক্তির একটি তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে দিয়েছেন বলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। বিএনপির প্রদত্ত নীতিমালার আলোকে এই ১০ জনের নাম দেওয়া হয়। বিএনপির প্রস্তাব অনুযায়ী বাছাই কমিটি হবে পাঁচ সদস্যের। এর আহ্বায়ক হবেন অবসরপ্রাপ্ত এবং কর্মক্ষম একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি। অন্য সদস্যরা হবেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতি, সরকারের অবসরপ্রাপ্ত একজন সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বা দলনিরপেক্ষ একজন বিশিষ্ট নাগরিক এবং দলনিরপেক্ষ একজন জ্যেষ্ঠ নারী। সচিব প্রশ্নে শর্ত এই যে, তিনি অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কাজ করেছেন এমন ব্যক্তি হবেন না। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে গঠনমূলক ও সুন্দর প্রস্তাব উত্থাপন করায় রাষ্ট্রপতি খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সংলাপে রাষ্ট্রপতি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরো বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে দেশে এখনো কোনো আইন তৈরি হয়নি। সুতরাং আইনের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক দলের মতৈক্যের কোনো বিকল্প নেই। তবে সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সরকার নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে একটি আইন করার প্রস্তাব বিবেচনা করছেন। নীতিগতভাবে রাষ্ট্রপতি একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন বলে বিএনপির ভাষ্যে বলা হয়। ফখরুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপতি মনে করেন, ভবিষ্যৎ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে এই প্রস্তাবনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচন কমিটি গঠন প্রশ্নে বাছাই কমিটি গঠনের যে প্রস্তাবনা বিএনপি দিয়েছে, এর পদ্ধতিগত বিষয়গুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে একটি যৌক্তিক সমাধানে আসবেন বলে মহাসচিব আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি খোলামেলাভাবে বলেন, ‘আমরা খুশি হয়েছি। আশাবাদী হয়েছি। রাষ্ট্রপতি একজন আপদমস্তক রাজনৈতিক নেতা, সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে তিনি দেশের রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবেন।’ বঙ্গভবনে আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে খালেদা জিয়া একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি প্রদান করেন। খালেদা জিয়া চিঠিতে আবেগময় ভাষায় বলেন, ‘দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশে, বিশেষ করে গত দুটি জাতীয় নির্বাচনে এবং গত কয়েক বছরে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা দেশে-বিদেশে আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণকে হতাশ, আস্থাহীন ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। বৃহত্তর জাতীয় ও গণতন্ত্রের স্বার্থে এ পরিস্থিতি আর চলতে পারে না।’
রাষ্ট্রপতি বিএনপির সঙ্গে সংলাপ করে তাঁর প্রতিশ্রুত আলোচনা শুরু করলেন। আগামী মাসের মধ্যে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বঙ্গভবন থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, অনুসন্ধান কমিটি গঠন ও নির্বাচন কমিশন গঠন সম্পর্কে বিএনপি যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা নির্বাচন কমিশন গঠনে সহায়ক হবে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিএনপির সংলাপ সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। প্রয়াত জিল্লুর রহমান যখন তাঁদের ডেকেছিলেন, তখন তাঁরা গিয়েছিলেন, তখন তাঁদের মনমতো হয়নি। সালিশ মানি, তালগাছটা আমার—এই যদি বিএনপির নীতি হয়, তাহলে এ সংলাপ সফল হবে না।’ তবে তিনি রাষ্ট্রপতির উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তিনি আরো বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে বিএনপি যদি গণভবনে যেত, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত। সাধারণভাবে রাষ্ট্রপতির এ উদ্যোগকে সব মত ও পথের লোক স্বাগত জানিয়েছে।
বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সময়সীমা আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ হবে বলে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। এই নির্বাচন কমিশনও গঠিত হয়েছিল বর্তমান সরকার নির্দেশিত সার্চ কমিটি বা বাছাই কমিটির মাধ্যমে। এই বাছাই কমিটি গঠনে কোনো রাজনৈতিক দলের মতামত নেওয়া হয়নি। সমালোচকরা বলেন, সেটি ছিল একটি আইওয়াশ। আর সেই কমিটি গত চার বছরে যে অকর্মণ্যতা, অযোগ্যতা ও অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, তা গোটা জাতিকে হতাশ করেছে। বিশেষত, সরকারের তল্পীবাহক হিসেবে তারা বদনাম কুড়িয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের কাছে তারা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে নিজেদের অযোগ্যতা নিজেরাই প্রমাণ করেছে। আগামী নির্বাচন কমিশন গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন তাদের হাতেই অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলো একটি নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনপ্রত্যাশী। সে কারণে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আলোকে বলা যায়, ক্ষমতাসীন সরকার বা ক্ষমতাসীন সরকার আদ্দিষ্ট ছোট নির্বাচনকালীন সরকার রেখে ইলেকশন কমিশন ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। সুতরাং নির্বাচনকালীন ইলেকশন কমিশন গঠনে গুরুত্ব আরোপ করার চেয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ধরনের যেকোনো ব্যবস্থায় না আসতে পারলে ভবিষ্যৎ নির্বাচন সফল হবে না। ক্ষমতাসীন সরকার গত সাত বছরে নির্বাচন ব্যবস্থার যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছে, তার জন্য বড় ধরনের সংস্কার অনিবার্য।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ড. আবদুল লতিফ মাসুম