কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে মাসব্যাপী অনুষ্ঠান
শরীয়তপুরে নড়িয়া উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক আবু ইসহাকের জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে মাসব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শুভ উদ্বোধন ও লোগো উন্মোচন করা হয়েছে। আজ রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে উপজেলা পরিষদ অডিটরিয়ামে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শফিকুর রহমান (কিরণ)। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাইয়ুম খান।
এ সময় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তি, শিক্ষক, সাংবাদিক, সাহিত্যপ্রেমী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকরা জানান, কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের সাহিত্যকর্ম ও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে মাসব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী সামাজিক উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’-এর জন্য সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও সমাদৃত আবু ইসহাক। মাত্র ২০ বছর বয়সে (১৯৪৬ সালে) এই অসাধারণ উপন্যাসটি রচনা করে তিনি বাংলা কথাসাহিত্যে নিজের স্থায়ী আসন নিশ্চিত করেন।
আবু ইসহাকের সাহিত্যকর্ম মাত্র আটটির মতো। লেখার গভীরতা ও বিষয়বস্তুর কারণে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছান। ১৯৪৩ সালের পঞ্চাশের মন্বন্তর (দুর্ভিক্ষ) এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ জনজীবনের যে বাস্তব চিত্র তিনি সূর্য দীঘল বাড়ী উপন্যাসে এঁকেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘জয়গুন’ নামের এক লড়াকু নারীর জীবনসংগ্রাম ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে টিকে থাকার গল্প পাঠকদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। পরে ১৯৭৯ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলে, যা তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
আবু ইসহাক ছিলেন একজন অত্যন্ত খাঁটি জীবনসন্ধানী লেখক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং দেশভাগের মতো ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষের জীবনের কষ্ট ও সংগ্রাম তিনি অতি নির্মোহভাবে তাঁর লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
তৎকালীন গ্রামীণ সমাজে ধর্মের নামে চলা কুসংস্কার, ফতোয়া এবং সাধারণ মানুষের অন্ধত্বকে আবু ইসহাক তাঁর গল্প ও উপন্যাসে সূক্ষ্ম কিন্তু তীব্র বিদ্রূপের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্প ‘জোঁক’ সমাজ ও মানুষের ওপর চলা শোষণের এক অসাধারণ প্রতীকী প্রকাশ।
পদ্মার চরের শ্রমজীবী মানুষের জীবন-সংগ্রাম নিয়ে লেখা আবু ইসহাকের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ (১৯৮৬) এবং গোয়েন্দা ধাঁচের উপন্যাস ‘জাল’ (১৯৮৮) পাঠক মহলে বেশ প্রশংসিত হয়। এ ছাড়া ‘হারেম’ ও ‘মহাপতঙ্গ’ নামের তাঁর গল্পগ্রন্থগুলোও বেশ জনপ্রিয়।
কেবল কথাসাহিত্যিক হিসেবেই নয়, আবু ইসহাক ‘সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান’ রচনা করেও ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর এই অভিধানের বিশেষত্ব ছিল শব্দের প্রচুর প্রতিশব্দ বা সমার্থক শব্দ যুক্ত করা (যেমন— কেবল ‘অন্ধকার’ শব্দেরই ১২৭টি সমার্থক শব্দ তিনি যুক্ত করেছিলেন এতে)।
বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য আবু ইসহাক বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৩), একুশে পদক (১৯৯৭) এবং মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে (২০০৪) ভূষিত হন।

আব্দুল আজিজ শিশির, শরীয়তপুর