শীতকালীন আগাম সবজির ভালো ফলনের আশা, ন্যায্যমূল্য নিয়ে শঙ্কা
শিশিরভেজা ভোরে সবুজ সবজিখেতে ব্যস্ত কৃষক। কোথাও ফুলকপি ও বাঁধাকপি, কোথাও শিম, করলা, বেগুন, লাউ আর শসার আবাদ। শীতের আগমনি বার্তায় মাঠজুড়ে এখন আগাম সবজি চাষ ও পরিচর্যার ব্যস্ততা।
ভালো ফলনের আশায় বুক বাঁধছেন কৃষকেরা। তবে সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে শেষ পর্যন্ত কতটা লাভ হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তাও রয়েছে তাঁদের।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া, সদর, সিংগাইরসহ বিভিন্ন এলাকায় আগাম শীতকালীন সবজির আবাদ হয়েছে।
কৃষকেরা জানান, মৌসুমের শুরুতে সবজির ভালো দাম পাওয়ার আশায় আগেভাগেই চাষাবাদ করেন তাঁরা। কিন্তু বাজারে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে গেলে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়ে।
সাটুরিয়া ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকেই সবজিখেতে কাজ করছেন কৃষক ও শ্রমিকেরা। কেউ গাছের পরিচর্যা করছেন, কেউ ফসল তুলছেন, আবার কেউ বাজারজাতের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফুলকপি ও বাঁধাকপির পাশাপাশি করলা, বেগুন, শিম, লাউ, শসা, ধনেপাতা ও লালশাকের আবাদও রয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, একদিকে উৎপাদন উপকরণের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে সবজির দাম ওঠানামা করছে। ফলে ভালো ফলন হলেই যে ভালো লাভ হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
ফুকুরহাটি গ্রামের সবজিচাষি বশির আহমেদ জানান, তিনি পাঁচ থেকে সাত বিঘা জমিতে ফুলকপির আবাদ করেছেন। প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং ফলন ভালো হলে প্রতি বিঘার ফুলকপি ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব বলে আশা করছেন তিনি। তবে সার, কীটনাশক, ছত্রাকনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন এই কৃষক।
আরেক কৃষক রহমত আলী বলেন, তিন বিঘা জমিতে ফুলকপি এবং দুই বিঘায় শসার চাষ করেছেন তিনি। শসার ফলন ভালো হয়েছে। ফুলকপিও বাজারে তোলার উপযোগী হচ্ছে। তবে বাজারদর অনুকূলে থাকলেই কেবল প্রত্যাশিত লাভের মুখ দেখবেন তাঁরা।
শুধু উৎপাদন খরচ নয়, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয়ও কৃষকদের দুশ্চিন্তার কারণ। সবজি ব্যবসায়ী আলী আহসান বলেন, গাড়িভাড়া, শ্রমিকের খরচ ও ক্যারেটের ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি কোনো কোনো সবজির দাম কমে যাওয়ায় পণ্য কিনে বাজারজাত করেও কাঙ্ক্ষিত লাভ থাকছে না। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই আর্থিক ঝুঁকিতে পড়ছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, খেত থেকে বাজার পর্যন্ত সবজির দাম নির্ধারণে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও বাজারে চাহিদা কমে গেলে কম দামেই সবজি বিক্রি করতে হয়। তাই উৎপাদিত সবজি সরাসরি বড় বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় কৃষি প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে কৃষি বিভাগের হিসাবে, অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত বীজ, যথাযথ পরিচর্যা এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শের কারণে এ বছর আগাম সবজি চাষে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে।
মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ জানান, আগাম শীতকালীন সবজির উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদিত সবজি জেলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি প্রতিদিন ঢাকার বাজারেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও কৃষিপণ্যের বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন। কৃষকের খেত থেকে উৎপাদিত সবজি সরাসরি বাজারে পৌঁছানোর ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন।
কৃষিনির্ভর মানিকগঞ্জের অর্থনীতিতে শীতকালীন সবজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ, মাঠভরা সবুজ ফসল তখনই কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবে, যখন উৎপাদন খরচ মিটিয়ে তাঁর হাতে থাকবে কাঙ্ক্ষিত লাভ।

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ