বাণিজ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষায় বাংলাদেশ-নেপাল সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং পর্যটনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। দুই দেশের পারস্পরিক সরকারি-বেসরকারি যোগাযোগ ও কার্যকর উদ্যোগ বাড়ানো গেলে এসব খাতে সম্পর্ক আরও গভীর ও বহুমাত্রিক মাত্রা পাবে বলে মনে করেন নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমান।
এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে এক বিশেষ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে নেপাল-বাংলাদেশ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।
রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমান জানান, নেপালের সম্ভাবনাময় বাজারে বাংলাদেশের মানসম্মত পণ্যের যেমন ইতিবাচক চাহিদা রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেও নেপালের পণ্য ও সেবার নতুন বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে। চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষার মতো সংবেদনশীল খাতগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পে দুই দেশের মানুষের যাতায়াত বৃদ্ধিতে বিশেষ জোর দেওয়া প্রয়োজন।
২১তম বিসিএস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. শফিকুর রহমান ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও দুই দেশের সার্বজনীন জনসম্পর্ক সুদৃঢ়করণে নিরলস কাজ করছেন।
সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হিমবাহধস ও আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এক মিলিয়ন মার্কিন ডলার (১০ লাখ ডলার) আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এই মানবিক সহযোগিতার জন্য নেপাল সরকার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এই প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, দুর্যোগের মতো যেকোনো কঠিন মুহূর্তে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর সুবাদেই দুই প্রতিবেশী দেশের সুসংহত ও বন্ধুত্বপূর্ণ ভিত্তি আরও মজবুত হচ্ছে।
এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের প্রশ্নোত্তর:
এনটিভি অনলাইন: বাংলাদেশ ও নেপালের বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্ককে কীভাবে দেখছেন?
মো. শফিকুর রহমান: বাংলাদেশ ও নেপালের বাণিজ্য বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এর জন্য দুই দেশের ব্যবসায়ী, বাণিজ্য সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে এখন অনেক আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে, যেগুলোর নেপালের বাজারে বড় চাহিদা রয়েছে। একইভাবে নেপালের কিছু বিশেষায়িত পণ্য ও সেবার জন্য বাংলাদেশেও পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
এনটিভি অনলাইন: বাংলাদেশি বিশেষ করে ইলেকট্রনিক পণ্যের সম্ভাবনা নেপালে কতটা?
মো. শফিকুর রহমান: বাংলাদেশ এখন আর কেবল তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল নয়; ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রীসহ নানা আধুনিক শিল্পপণ্য উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছে এবং রপ্তানি করছে। নেপালেও এ পণ্যের ভালো বাজার রয়েছে। পণ্যের উৎকর্ষ, যৌক্তিক মূল্য, মসৃণ বিক্রয়োত্তর সেবা ও গতিশীল বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করতে পারলে নেপালের বাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
এনটিভি অনলাইন: চিকিৎসা খাতে দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা কীভাবে বাড়ানো যায়?
মো. শফিকুর রহমান: চিকিৎসা খাতে যৌথ কাজের অনেক পথ খোলা রয়েছে। বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার মান যথেষ্ট উন্নত এবং নেপাল থেকে বহু রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশে আসতে পারেন। পাশাপাশি উভয় দেশের ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঝে নিয়মিত অভিজ্ঞতা বিনিময় ও উচ্চতর ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা যায়। হাসপাতালগুলোর মধ্যে সংযোগ বাড়লে উভয় পক্ষই সুফল পাবে।
এনটিভি অনলাইন: শিক্ষাক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ বাড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
মো. শফিকুর রহমান: উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতার বড় সুযোগ রয়েছে। দুই দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একাডেমি ও গবেষণা সমন্বয়, স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এতে তরুণ প্রজন্ম উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি সম্পর্কের ভিত্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে।
এনটিভি অনলাইন: সাম্প্রতিক বন্যা ও হিমবাহধসে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালকে বাংলাদেশের ১০ লাখ ডলারের সহায়তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মো. শফিকুর রহমান: বাংলাদেশ-নেপাল সম্পর্ক শুধু প্রথাগত রাষ্ট্রীয় বা কূটনৈতিক প্রটোকলে আবদ্ধ নয়, এটি দুই দেশের মানুষের হৃদয়ের সম্পর্ক। নেপালের এই কঠিন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বাংলাদেশ সরকার আন্তরিক মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। নেপাল সরকার এই বন্ধুত্বের জন্য গভীর ধন্যবাদ জানিয়েছে। দুর্দিনে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত বন্ধুত্বের প্রতিচ্ছবি।
এনটিভি অনলাইন: পর্যটন খাতে উভয় দেশের পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে করণীয় কী?
মো. শফিকুর রহমান: নেপাল তার অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রচুর বাংলাদেশি সেখানে যান। একইভাবে আমরাও নেপালি পর্যটকদের বাংলাদেশে স্বাগতম জানাতে পারি। বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অনিন্দ্য সুন্দর প্রাকৃতিক রূপ তাদের কাছে সঠিকভাবে প্রচার করতে হবে। যাতায়াত ও পর্যটন সুবিধা আধুনিকায়ন করলে উভয় দেশে পর্যটক প্রবাহ অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।
এনটিভি অনলাইন: দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কোনগুলো বলে মনে করেন?
মো. শফিকুর রহমান: মূল ক্ষেত্রগুলো হলো—বাণিজ্য, কৌশলগত বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পর্যটন। আমাদের প্রধান কাজ হবে সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করা। সরকারি পর্ষদ, বাণিজ্য চেম্বার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ জনগণের যোগাযোগ যত নিবিড় হবে, কূটনৈতিক বন্ধুত্ব ততটাই সুদৃঢ় হবে।

শহীদুল ইসলাম বাবর, দক্ষিণ চট্টগ্রাম