বৃষ্টিতে ফুটো চালের নিচে কাটে রাত, প্রতিবন্ধী স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই
আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা আর গুরুগুরু গর্জন শুনলেই বুকটা ধরাস করে ওঠে শিখা বেগমের। সাধারণ মানুষের কাছে বর্ষার বৃষ্টি যখন স্বস্তি আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে, তখন শিখা বেগমের পরিবারের জন্য তা বয়ে আনে এক বিভীষিকাময় দুর্ভোগ। টিনের জরাজীর্ণ চালের ফুটো দিয়ে যখন টপটপ করে পানি পড়তে শুরু করে, তখন কাঁচা মেঝে ভেসে গিয়ে থকথকে কাদায় রূপ নেয়। ভিজে একাকার হয়ে যায় একমাত্র বিছানা, পরনের কাপড় আর হাঁড়ি-পাতিল। অবুঝ দুই সন্তান আর পঙ্গু স্বামীকে আঁকড়ে ধরে ঘরের এক কোণে গাদাগাদি করে বসে বৃষ্টি থামার প্রহর গোনা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না এই অসহায় নারীর।
রংপুরের পীরগঞ্জ পৌর এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ওসমানপুর গ্রামের বাসিন্দা শিখা বেগমের জীবনটাই যেন এক প্রলম্বিত কষ্টের আখ্যান। একসময় স্বামী শাহ আলম মিয়ার দিনমজুরির আয়েই হাসিখুশি ভেসে চলত চার সদস্যের সংসার। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে কয়েক বছর আগে এক কর্মস্থলে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শাহ আলমের দুটি পা-ই চিরতরে অকেজো হয়ে যায়। উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে মুহূর্তেই বদলে যায় পরিবারের ভাগ্যরেখা। পঙ্গু স্বামী আর দুই দুধের শিশুর মুখে একমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার পুরো ভার একা এসে পড়ে শিখা বেগমের কাঁধে।
বর্তমানে স্থানীয় স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে সিনহা আক্তার এবং তিন বছরের অবুঝ শিশু সাসিহা আক্তারকে নিয়ে প্রতিদিন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। পরিবারটির একমাত্র থাকার ঘরটির অবস্থাও চরম ঝুঁকিপূর্ণ। জরাজীর্ণ মাটির দেওয়ালের বেশির ভাগ অংশের মাটি খসে পড়েছে, আর ওপরের টিনের চালে এতটাই ছিদ্র যে ঘর থেকে সোজা আকাশ দেখা যায়! সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের ভেতরে যেন আরেক পশলা বৃষ্টি শুরু হয়। পানি আটকানোর আশায় ঘরে হাঁড়ি-পাতিল ও বালতি বসিয়েও রক্ষা হয় না। বর্ষা এলেই স্যাঁতসেঁতে ভেজা ঘরে জীবন কাটানো হয়ে ওঠে অবর্ণনীয়।
ঘরের ভেতর ঢুকলেই চোখে পড়ে এক করুণ চিত্র। জরাজীর্ণ ঘরের এক কোণে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে দড়ি টাঙিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ভেজা কাপড়চোপড়। নিরাপদ ও মানসম্মতভাবে বসবাসের ন্যূনতম সুযোগও নেই পরিবারটির।
চোখের জল মুছতে মুছতে শিখা বেগম বলেন, একটা ভালো ঘর তোলার মতো সামর্থ্য আমার নেই। একটুখানি বৃষ্টি হলেই চাল দিয়ে হু-হু করে পানি পড়ে। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে যে কী কষ্টে থাকি, তা শুধু আল্লাহই জানে। কতো রাত যে বাচ্চাদের কোলে নিয়ে ভেজা কোণে বসে বসেই পার করে দিয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই। বিছানা-কাপড় সব ভিজে একাকার হয়ে যায়।
প্রতিবেশী মো. আল আমীন বলেন, শিখা বেগম যে ঘরে থাকেন, সেটাকে কোনোভাবেই মানুষের থাকার ঘর বলা চলে না। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পরে। পঙ্গু স্বামী আর ছোট দুটি অবুঝ বাচ্চা নিয়ে পরিবারটি বড় করুণ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। সমাজের বিত্তবান বা সরকারি একটুখানি সহায়তা পেলে হয়তো পরিবারটি একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেত।
এ বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বিষয়টি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।
ফুটো চালের নিচে কাদা-পানিতে ভিজে রাত কাটানো শিখা বেগমের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ই এখন একমাত্র স্বপ্ন। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিত্তবানদের সামান্য সহানুভূতি ও একটুখানি সহায়তার হাত হয়তো কালবৈশাখী আর শ্রাবণের বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে এই পরিবারটিকে উপহার দিতে পারে এক টুকরো শান্তির ঠিকানা।

মো. রতন মিয়া, রংপুর (পীরগঞ্জ-মিঠাপুকুর)