আবু সাঈদের ফুটেজের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে এনটিভির বিশেষ স্বীকৃতি পাওয়া উচিত : চিফ প্রসিকিউটর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেছেন, এনটিভির এই ফুটেজটা না হলে আন্দোলন এমন করে দানা বেঁধে উঠত কিনা, ফ্যাসিস্টের পতনটা এই প্রক্রিয়ায় হতো কিনা, আমার তো যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি এনটিভি এই জন্যে সরকারের পক্ষ থেকে হোক, সমাজের পক্ষ থেকে হোক, একটা বিশেষ স্বীকৃতি পাওয়া উচিত। এনটিভির এই ফুটেজ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে সারা জীবন, যুগ যুগ বহাল থাকবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রথম শহীদ মো. আবু সাঈদ হত্যা মামলায় প্রমাণ হিসেবে এনটিভির লাইভ ভিডিও ফুটেজের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম এক প্রতিক্রিয়ায় আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) একথা বলেন।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় প্রমাণ হিসেবে এনটিভির সেই ভিডিও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়। একই সাথে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষ্য দেন সাংবাদিক এ কে এম মঈনুল হক। সাক্ষ্যে ঘটনার ভয়াবহ চিত্র তিনি ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেন। রায়ে ট্রাইব্যুনাল সেই ভিডিওর জন্য এনটিভিকে এবং সাক্ষী দেওয়ার জন্য এনটিভির রংপুরের সাংবাদিক মঈনুল হককে ধন্যবাদ জানিয়েছে সাবেক ও বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর।
আগামী দিনেও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা প্রমাণে এনটিভির মতো অন্যান্য গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে সেই প্রত্যাশা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বর্তমান ও সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ও তাজুল ইসলাম।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, এনটিভির একটি ভিডিও এবং চ্যানেলের রংপুরের সাংবাদিক একেএম মইনুল হকের চাক্ষুস সাক্ষে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। আর সেই ভিডিও এবং সাক্ষ্যের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় রংপুরের আবু সাঈদকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। সেই হত্যার দায়ে আসামিদের সাজাও দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
সাবেক প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, এই ভিডিওটি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা আমরা প্রথম থেকেই জানতাম। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে এনটিভির এই ভিডিওটি জব্দ করার উদ্যোগ গ্রহণ করি।
শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে গালি দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফুসে উঠে ছাত্রছাত্রীরা। সেই দাবানল ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এরইমধ্যে ১৫ জুলাই ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে পরদিন ১৬ জুলাই দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে। সেদিন সারা দেশে পুলিশ ও ছাত্রলীগ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মারমুখী অবস্থান নিয়েছিল।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে রংপুরের বেরোবি ক্যাম্পাসের ১ নম্বর গেটের সামনের সড়কে। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা জড়ো হলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ শুরু করে। একপর্যায়ে সবাই যখন ছত্রভঙ্গ, তখন রাস্তার মাঝে পুলিশের মুখোমুখি দুহাত প্রসারিত করে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে যান বেরোবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার হাতে ছিল কেবল একটি লাঠি। মাত্র ১৫ মিটার দূরে রাস্তার উল্টো পাশ থেকে পুলিশ শটগান দিয়ে সরাসরি তার বুক লক্ষ্য করে গুলি চালায়। একের পর এক গুলি লাগার পরও সাঈদ বুক টান করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আন্দোলনের এই সমন্বয়ক।
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভির ক্যামেরায় সরাসরি সম্প্রচারিত এই দৃশ্য মুহূর্তেই কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। আবু সাঈদের সেই বুক পেতে দেওয়ার ভিডিও ক্লিপটিই মূলত ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলে। যা পরবর্তীতে রূপ নেয় ছাত্র-জনতার অপ্রতিরোধ্য ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে। ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়ে বদলে দেয় বাংলাদেশের ইতিহাস। আজ ইতিহাসের সেই বাঁক বদলানো রক্তাক্ত ১৬ জুলাইয়ের দ্বিতীয় বার্ষিকী।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। ঠিক দুপুর বেলায় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইটের সামনে তখন। আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ। সেই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। তখন দুপুর সোয়া দুইটা, এনটিভির দুপুরের সংবাদ সম্প্রচার চলছিল। সেই সময় সরাসরি ঘটনার বর্ণন্য দিচ্ছিলেন এনটিভির রংপুরের সাংবাদিক একেএম মঈনুল হক। আর ভিডিও ধারণ করছিলেন ক্যামেরাম্যান আসাদুজ্জামান আরমান। ধারা বর্ণনার সময়ই দেখা যায়, পুলিশ আবু সাঈদের ওপর গুলি চালাচ্ছে। সেই ঘটনা এনটিভির মাধ্যমে সারাদেশ সহ পুরো বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে।

নিজস্ব প্রতিবেদক