ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আদেশ, নির্দেশ ও উসকানি দেওয়ার তথ্য
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যা, শেখ হাসিনার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে দমন-নীপড়নে সহায়তা করা ও উসকানি দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) বেলা দেড়টার পর রায় ঘোষণা করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যর বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্যরা হলেন, বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এ মামলায় হাসানুল হক ইনু একমাত্র আসামি।
মামলার জবানবন্দিতে ১০ জন সাক্ষী ইনুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, উসকানি ও হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন।
জবানবন্দিতে ইনুর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষী আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, আমার বর্তমান বয়স আনুমানিক ৪৫ বৎসর। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় উপ-সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর মহোদয় তদন্ত সংস্থার কনফারেন্স রেজিস্টার এর ক্রমিক নং ১৬২, তারিখ: ২৫/০৩/২০২৫ মামলাটি তদন্তের জন্য আমার নামে হস্তান্তর করলে আমি তদন্তভার গ্রহণ করি। তদন্তকালে জনাব তানভীর হাসান জোয়া, বিশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর আমাকে সহায়তা প্রদান করেন। তদন্তভার গ্রহণ করে তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর আনসার উদ্দিন খান পাঠান এবং কো-কো-অর্ডিনেটর জনাব মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ চৌধুরী, পিপিএম মহোদয়গণের সার্বিক সহযোগিতায় ও নির্দেশনায় মামলার সংশ্লিষ্ট উপাত্ত বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংক্রান্তে প্রকাশিত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিটিভি, মিরর নাও, মিরর নিউজ, আরটিভি, চ্যানেল টুয়েন্টি ফোর, এমটিভি-সহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াসহ গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ পূর্বক পর্যালোচনা করি। ঘটনাকালীন সময়ে ঘাতক কর্তৃক প্রকাশিত ও সম্প্রচারিত ভিডিও চিত্র ও পত্র-পত্রিকা সংগ্রহ পূর্বক পর্যালোচনা করি। তদন্ত সংস্থার সংরক্ষিত ঘটনাকালীন সময়ে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আদেশ, নির্দেশ, উসকানিমূলক বক্তব্য ও বিবৃতি, লিফলেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত পোস্ট এবং মন্তব্য সংগ্রহ পূর্বক পর্যালোচনা করি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ব্যক্তিদের পরিবার-পরিজন, জখমপ্রাপ্ত জুলাই যোদ্ধাসহ সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ পূর্বক তাদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করি। পত্র পত্রিকা, ভিডিও ফুটেজসহ অন্যান্য আলামত জব্দ করি। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিকট হতে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সম্বলিত প্রতিবেদন সংগ্রহ করি। সংগ্রিহিত আলামত পরীক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞদের নিকট প্রেরণ করি এবং মতামত গ্রহণ করি।
প্রসঙ্গত শেখ হাসিনার সঙ্গে হাসানুল হক ইনু সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতেন। আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র (লেথাল উইপন) ব্যবহার করে, ছত্রীসেনা নামানো, হেলিকপ্টার দিয়ে গুলি করে হত্যা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনাসহ শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিতেন ইনু। ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই হাসানুল হক ইনু নিউজ টোয়েন্টিফোর চ্যানেলে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি, সাম্প্রদায়িক ইত্যাদি ট্যাগ প্রদান করে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। সেই সঙ্গে কারফিউ জারি করে মারণাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের হত্যাকাণ্ড সংঘটনসহ নির্যাতন–নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করেন এই আসামি।
মামলার এজাহার সুত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহতের ঘটনা এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে কলরেকর্ডের কথোপকথনের অডিওতে আন্দোলনকারীদের দমন-নীপড়ন ও হত্যায় উসকানি দিয়ে ষড়যন্ত্র ও সহায়তার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়।
২০২৫ সালের ২৫ মার্চ মামলার তদন্ত শুরু হয়। ওই বছর ১১ সেপ্টেম্বর মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরে গত বছরের ২ নভেম্বর এ মামলায় অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ইনুর বিরুদ্ধে আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, নিজের নির্বাচনি এলাকা কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় উসকানি দেওয়া, শেখ হাসিনার সঙ্গে থেকে আন্দোলনকারীদের দমনে গুলির নির্দেশ দেওয়া, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের গুলির নির্দেশ দেওয়া ইত্যাদি।
আরও পড়ুন : জুলাইয়ে হাসিনার দমন-নিপীড়নে ‘সায় দেওয়া’ ইনুর রায় আজ
এ মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষে ১০ জন এবং আসামিপক্ষে দুইজন সাফাই সাক্ষ্য দেন। চলতি বছর ১৩ এপ্রিল যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়ে ১৩ মে শেষ হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য মতে, মামলাটির তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ৩ মার্চ। পরে তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চার্জ গঠন করা হয়। চলতি বছরের ১৩ মে যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়।
এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার তরফদার, প্রসিকিউটর মীজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর ফারুক আহমেদ, প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার পালোয়ান প্রমুখ। অপরদিকে হাসানুল হক ইনুর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী ও নাজনীন আহসান।
কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত
প্রসিকিউশন জানায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়া শহরে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। আহত হন বহু নিরীহ মানুষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইনুর বিরুদ্ধে উসকানি, প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রসহ সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর একমাত্র আসামির ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল প্রসিকিউশন। এতে তার বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়।
৩৯ পৃষ্ঠার এই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)। এতে ২০ জনকে সাক্ষী রাখা হয়। তবে ১০ জন সাক্ষী দিয়ে এ মামলার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক