রূপপুরে যেভাবে ফুয়েল লোডিং হবে
পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে অনন্য এক অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে। আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বেলা আড়াইটার দিকে পাবনার ঈশ্বরদীতে এ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে (ইউনিট-১) ফুয়েল লোডিং হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিচালন পর্বে প্রবেশ করবে।
এ কার্যক্রমের সব প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে প্রকল্পের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস বলেন, রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এবং দেশীয় দক্ষ প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে বিকেল থেকে রিঅ্যাক্টর কোরে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন শুরু হবে।
গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইউনিট-১ এর জন্য জ্বালানি লোডিংয়ের আনুষ্ঠানিক লাইসেন্স দেয়। এর আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মানদণ্ড অনুযায়ী কয়েক স্তরের নিরাপত্তা পরীক্ষা ও প্রি-অপারেশনাল টেস্ট সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়া কীভাবে?
ইউরেনিয়াম ফুয়েল লোডিং হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চূড়ান্ত কারিগরি প্রক্রিয়া। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা, গ্যাস বা তেলের বদলে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামের ছোট ছোট পেলেট ব্যবহার করা হয়, যার প্রতিটি সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে। এই পেলেটগুলোকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি টিউবের ভেতর সাজিয়ে ‘ফুয়েল অ্যাসেম্বলি’ তৈরি করা হয়।
এই অ্যাসেম্বলিগুলোকে রিঅ্যাক্টরের ভেতর স্থাপন করার প্রক্রিয়াই হলো ফুয়েল লোডিং। এটি সম্পন্ন হওয়ার পরই বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ফিশন বা চেইন রিঅ্যাকশন (চুল্লিতে তাপ উৎপাদন) শুরু করা সম্ভব হয়। ফুয়েল লোডিং একটি অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। একটি বিশেষ ‘ফুয়েল লোডিং মেশিন’ বা রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে এই কাজ সম্পন্ন করা হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে এ প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে। ফুয়েল লোডিংয়ের সময় রিঅ্যাক্টরের ভেতরের অংশ বা রিঅ্যাক্টর ভ্যাসেল পানিতে পূর্ণ রাখা হয়। কারণ পানি বিকিরণ প্রতিরোধে সহায়তা করে। এরপর রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি একে একে রিঅ্যাক্টর কোরের ভেতর নির্ধারিত স্থানে বসানো হবে। প্রতিটি অ্যাসেম্বলি কোথায় বসবে, তা আগেই নির্ধারিত থাকে।
বিদ্যুৎ পেতে আরও ৩ মাস অপেক্ষা
ফুয়েল বসানোর পর কন্ট্রোল রড (যা ফিশন রিয়্যাকশন নিয়ন্ত্রণ করে) সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে। ১৬৩টি অ্যাসেম্বলি রিঅ্যাক্টর কোরে সফলভাবে লোড করার পর কেন্দ্রটিকে ‘মিনিমাম নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতায়’ আনা হবে। এই পর্যায়টিকে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি বলা হয়, যেখান থেকে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হবে।
তবে আজ জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম শুরু হলেও বিদ্যুৎ পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও ৩ মাস।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও রুশ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে আজ (২৮ এপ্রিল) জ্বালানি লোডিংয়ের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া শুরুর তিন মাসের মধ্যে- অর্থাৎ জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক