পারমাণবিক যুগে বাংলাদেশ : বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন
৬৫ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশের ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করল বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পাবনার ঈশ্বরদীতে এ প্রকল্পে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি (ফুয়েল) লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করল পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে।
আজ সোমবার (২৮ এপ্রিল) বেলা সাড়ে তিনটার দিকে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধন করেন অতিথিরা।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্জন প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দেশ। এখানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ইউরেনিয়াম-২৩৫ বা ইউ-২৩৫, যা রাশিয়া থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সরবরাহ করা হয়েছে।
এই জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর। পারমাণবিক জ্বালানি ছোট ছোট পেলেট আকারে থাকে, যেগুলো জিরকোনিয়াম অ্যালয় টিউবের ভেতরে ভরে তৈরি করা হয় ফুয়েল রড। আর এসব রড একত্রিত হয়ে গঠন করে ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। রূপপুরের প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা হবে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সভাপতিত্বে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।
এতে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর টেলিকম এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি। এর আগে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কিত একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে রাশিয়া আমাদের পরম বন্ধু। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ে প্রকল্প কমিশনিংয়ের লক্ষ্যে কাজ চলছিল। আজ সেই কাঙ্ক্ষিত দিনে জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়া একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম আরও বলেন, বহু বছরের পরিকল্পনা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সফল বাস্তবায়ন ঘটেছে রূপপুর প্রকল্পে। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফলেই এমন অর্জন সম্ভব হয়েছে।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, শিল্পায়ন, আধুনিকায়ন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন, নির্ভরযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি অত্যাবশ্যক। এ বাস্তবতায় পারমাণবিক শক্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, রূপপুর প্রকল্পে ফুয়েল লোডিং বাংলাদেশের জন্য একটি গৌরবময় অর্জন। এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দেশীয় সক্ষমতার প্রতিফলন।
রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যেমন সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতেও সেই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন করতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগবে। এরপর ধাপে ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। প্রাথমিকভাবে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) প্রথম ইউনিটের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করে, যা জ্বালানি লোডিংয়ের পথ সুগম করে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান জানান, কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ৫২ বিশেষজ্ঞ লাইসেন্স অর্জন করেছেন। তাদের সঙ্গে রাশিয়ার লাইসেন্সধারী অপারেটরদের সমন্বয়ে কেন্দ্র পরিচালিত হবে।
প্রকল্প কর্মকর্তারা আরও জানান, উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে এবং পূর্ণ সক্ষমতায় (১২০০ মেগাওয়াট) পৌঁছাতে আট থেকে ১০ মাস সময় লাগতে পারে। এ ছাড়া এ বছরের শেষ দিকে দ্বিতীয় ইউনিটেও ফুয়েল লোডিং শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা রয়েছে। দুটি ভিভিইআর-এক হাজার ২০০ রিয়্যাক্টর সমন্বয়ে গঠিত এ কেন্দ্রের দুই ইউনিট পূর্ণ উৎপাদনে গেলে মোট দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে, যা দেশের মোট চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করবে।
রূপপুরের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, আমরা কোনোদিনও চিন্তা করিনি, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে আর এখানে আলো ঝলমল করবে। এটি অবিশ্বাস্য ব্যাপার।
আব্দুস সামাদ নামের এক তরকারি ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের ক্রেতা মূলত রাশিয়ানরা। আমরা এখন রাশিয়ান ভাষায় কথা বলি। তারা আমাদের কথা বোঝে আমরাও তাদের কথা বুঝি।

এ বি এম ফজলুর রহমান, পাবনা