সুনামগঞ্জের হাওরে আকস্মিক বন্যার শঙ্কায় দিশেহারা কৃষকরা
সুনামগঞ্জে হাওরে আকস্মিক বন্যার শঙ্কায় দিশেহারা কৃষকরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে এ বছর দুই লাখ ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ফলনও হয়েছে বাম্পার। আজ সোমবার পর্যন্ত ৫১ ভাগ হাওরের বোরো ধান কাটা হয়েছে। হাওরে এখনও অর্ধেক ধান জমিতে পড়ে আছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সুনামগঞ্জে আকস্মিক বন্যার সতর্কতা জারি করে ৮০ ভাগ ধান পেকে গেলেই ধান কেটে নিতে বিজ্ঞপ্তি জারি করে এলাকায় মাইকিং করছে। একদিকে বন্যার পূর্বাভাস, অন্যদিকে ধান কাটার শ্রমিক সংকট। হাওরে কৃষকের সারা বছরের আহার। সব কিছু মিলিয়ে হাওর এলাকায় এখন অস্থির পরিবেশ বিরাজ করছে। আকস্মিক বন্যার শঙ্কাসহ নানা কারণে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। একদিকে বন্যার পুর্বাভাস, অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে ধান কাটা ও মাড়াইয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের। বন্যার ভয়, দুর্ভোগ নিয়েই হাওরের কৃষকরা ফসল তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করছে।
জেলার সদর উপজেলার দেখার হাওরপাড়ের আব্দুল্লাহপুর গ্রামে গ্রামের কৃষক মানিক মিয়া (৪০) জানান, বন্যার আশঙ্কার কথা শুনেই আতংকে আছেন তিনি। এক সপ্তাহ হাওরে জলাবদ্ধতা ছিল, অর্ধেক ধান তলিয়ে গেছে। বাকি অর্ধেক ধান এখন যাচ্ছে। সারা বছর কীভাবে কাটবে আল্লাহই জানেন।
রোববার দিনভর থেমে থেকে বৃষ্টি হয়েছে। সকালে ভারি বৃষ্টি। শনিবার রাতেও বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী সোমবারও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হবে। ২৮ এপ্রিল থেকে শুরু হবে ভারি বৃষ্টি। জেলার উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে একইভাবে ব্যাপক বৃষ্টি হবে। এতে পাহাড়ি ঢল নেমে জেলার হাওর এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। গত কয়েকদিন ঢলের পানি নামায় সুনামগঞ্জের নদ-নদীতে পানি বেড়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, ‘বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। তবে সোমবার সকালে নদীর পানি কিছুটা কমেছে। বৃষ্টি হলেই তা আরও বাড়বে। এমনিতেই বৃষ্টিতে ফসল রক্ষা বাঁধের মাটি দুর্বল হয়ে আছে। উজানের ঢল নামলে সেই ঢলের চাপ অনেক ফসল রক্ষা বাঁধ এখন আর সামলাতে পারবে না।’
পাউবো এবার সুনামগঞ্জে হাওরের ফসল রক্ষায় ১৪৫ কোটি টাকা প্রাক্কলন ধরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানান, জেলার ১৩৭টি হাওরে এবার দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, শনিবার পর্যন্ত ধান কাটা হয়েছে ৭৮ হাজার ২২৮ হেক্টর। গতকাল রোববার পর্যন্ত আর অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় ক্ষতি হয়েছে পাঁচ হাজার ৫০ হেক্টর। হাওরে এখনও এক লাখ ৪৫ হাজার ২৮২ হেক্টর জমিতে ধান রয়ে গেছে। জমিতে থাকা ধানের মধ্যে আবার অর্ধেক এখনো পাকেনি। এবার মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি না হওয়ায় ধান পাকতে সময় নিচ্ছে বেশি। জেলায় ৬০২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টর রয়েছে। সেগুলোর পাশাপাশি হাওরের কৃষকেরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন জমির পাকা ধান কেটে তোলার। অনেক স্থানে জলাবদ্ধতার কারণে কম্বাইন্ড হারভেস্টরে ধান কাটতে সমস্যা হচ্ছে। সংকট রয়েছে ধানকাটা শ্রমিকেরও। এ কারণে সমস্যায় আছেন কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুকের কাছে সোমবার পর্যন্ত কত ধান কাটা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজ সোমবার সকাল থেকে বৃষ্টি হওয়ায় ধান কাটা বন্ধ আছে। এখন হাওরে ফসল থাকা মানেই ঝুঁকি। বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকাতে সমস্যা হচ্ছে। সঙ্গে বন্যার আশঙ্কা তো আছেই। আমরা দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করছি কৃষকদের।
২০১৭ সালে সুনামগঞ্জের হাওরে অকালবন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে সব ফসল তলিয়ে যায়। এতে জেলায় খাদ্য সংকট দেখা দেয়। দেশে চালের দাম তখন বেড়ে গিয়েছিল। সরকার জেলার প্রায় দুই লাখ কৃষক পরিবারকে টানা এক বছর খাদ্য সহায়তা দিয়েছিল তখন।
এ প্রসঙ্গে ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলনের’ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, ‘আমাদের হাওর এলাকার কৃষকরা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখেন। কিন্তু এই কৃষকের আজ ঘুম নেই। হাওরে হাহাকার শুরু হয়েছে। ফসল নিয়ে সবাই দুশ্চিন্তায়। হাওরের ফসল রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের এক ধরনের অবহেলা থাকে। এই সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, হাওরের কৃষকের সর্বনাশ হয়ে গেছে। এখন কোনো উপায় নেই। হাওরে অর্ধেকেরও বেশি ফসল নিয়ে কৃষকরা বড় বিপদে পড়েছে এবং তাদের সান্ত্বনা দেয়ারও কেউ নেই।

দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী, সুনামগঞ্জ