বাতিঘরের ব্যতিক্রমী আয়োজন ‘শৈশবের গল্পে পুতুল বিয়ে’র উৎসব
আনন্দের মধ্যদিয়ে শিশুশিক্ষার ব্রত নিয়ে শুরু হওয়া ‘বাতিঘর সাংস্কৃতিক বিদ্যালয়’ ১৩ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে একটি ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ছায়ানট ভবনের রমেশ চন্দ্র দত্ত মিলনায়তনে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘শৈশবের গল্পে পুতুল বিয়ে’র উৎসব। বাতিঘরের লালমাটিয়া, বনশ্রী, মিরপুর, সিদ্ধেশ্বরী ও ইস্কাটন শাখার অর্ধশতাধিক শিশু মনোজ্ঞ এই সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেয়।
জাতীয় সংগীত শেষে ‘হে সামালো ধান হো’, ‘আমরা করবো জয়’ ও ‘জগতজুড়ে উদার সুরে’ গানের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে শিশুরা নৃত্য পরিবেশন করে। এরপর শুরু হয় বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এক অন্যতম অনুষঙ্গ পুতুল বিয়ে পর্ব। পুতুল বিয়ের পর্বে সবাইকে স্বাগত জানায় আরাফ ও পূর্ণতা। পুতুল বিয়ের অনুষ্ঠানে কেন দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করা হলো— পূর্ণতার এ প্রশ্নের জবাবে আরাফ তার চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়ে উপস্থিত শিশু ও দর্শকদের মধ্যে দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরে।
ছেলেবেলার গল্পে কেমন ছিল পুতুল বিয়ের কাহিনী— সে কথা বলতে মঞ্চে হাজির হন সংগীতশিল্পী রফিকুল আজিজ টিটো। সংগীত শিক্ষক হিসেবে তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙিতে শিশুদের পুতুল বিয়ের গল্প বলে পুরো মিলনায়তনজুড়ে শ্রোতাদের উৎফুল্ল করে তোলেন।
এরপর আরিবা ও প্রকৃতির আহ্বানে মঞ্চে আসে গিটারবন্ধুরা। গিটারে শিশুরা পরিবেশন করে ড. তপন বাগচীর লেখা ও সুজিত মোস্তফার সুরারোপিত গান ‘আজকে না হয় আমরা ছোট, একদিন হবো বড়, লেখাপড়ায় মন দিয়ে তাই, জীবনটাকে গড়ো।’ এ পর্বে গিটারে অংশ নেয় অনির্বাণ, ওয়াফি, টুইঙ্কেল, গোপাল, রামিন, ঋদিতা ও পূর্ণতা।
গিটার পর্বের পর শুরু হয় পুতুল বিয়ের উৎসব। বিয়ের চিরায়ত গানের সঙ্গে মঞ্চের একপাশে চলতে থাকে বিয়ের নানা আনুষ্ঠানিকতা আর ঠিক তার অপর পাশেই শিশুদের গীতনৃত্য। ‘আসবে শ্যাম কালিয়া’, ‘ঢোল বাজে আকাশে’, ‘সোহাগ চাঁদ বদনী ধনি নাচতো দেখি’, ‘দাও গায়ে হলুদ’, ‘সাজ সুন্দরী কন্যা সাজো বিয়ার সাজে’ ইত্যাদি গানের সঙ্গে যেন পুরো মিলনায়তনজুড়ে শ্রোতা-দর্শকরা উপভোগ করেন সত্যিকারের বিয়ের আনন্দ। কি ছিল না সেখানে-বধূবরণ, জামাইবরণ, গায়ে হলুদ থেকে শুরু মিষ্টিমুখ— সবই যেন নগরশিশুদের এক গ্রামীণ জনপদের বিয়ের আনন্দে মাতিয়ে তোলে। এমন গ্রামীণ চিরায়ত দৃশ্য দেখে সবাই বেশ উৎফুল্ল, আনন্দিত।
নগর সভ্যতার কারণে আমরা দিন দিন যেখানে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতিকে ভুলতে বসেছি, সেখানে বাতিঘরের শিশুদের নিয়ে এমন একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন আমাদের শেকড়ের সন্ধানী করে তোলে। মনে করিয়ে দেয় আমাদের অতীতের, শৈশবের স্মৃতি। মিলনায়তনজুড়ে শিশুদের হৈ-হুল্লোড় ও উচ্ছ্বাস এবং উপস্থিত অভিভাবক ও দর্শক-শ্রোতাদের করতালি যেন বাতিঘরের এই আয়োজনকে সার্থক করে তোলে।
পুরো অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ছিলেন বাতিঘরের শিক্ষক শ্রাবন্তী পাল তন্বী। তিনি বলেন, বাতিঘরের শিশুরা দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ সম্পর্কে জানুন। আনন্দের মধ্য দিয়ে সে তার শৈশব অতিক্রম করুক। সবচেয়ে বড়কথা— ‘বিশ্বমানব হবি যদি শাশ্বত বাঙালি হ’ গুরুসদয় দত্তের এই অমিয় বাণীকে ধারণ করে আমাদের সন্তানেরা সর্বান্তকরণে মানুষ হয়ে উঠুক। আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য বুকে ধারণ করে সে বিশ্বসভায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক। বাতিঘর শিশুদের সেই শিক্ষাটাই দিতে চায়। বাতিঘরের শিশুদের সব অভিভাবককে ধন্যবাদ জানাই তাদের শিশুদের বাতিঘরের সঙ্গে যুক্ত রাখার জন্যে।
বাতিঘরের পরিচালক মরিয়াম ইউসুফ বাতিঘরের সব শিশুর অভিভাবকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমরা চাই আনন্দের মধ্য দিয়ে শিশুদের শেখাতে। আমরা সবসময়ই ব্যতিক্রম কিছু করার চেষ্টা করি। শুরু থেকে এ পর্যন্ত আমাদের প্রত্যেকটা অনুষ্ঠানে আমরা শিশুদের নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিয়ে গেছি। সে নতুন বিষয় জেনেছে-দেখেছে-শিখেছে। বাতিঘরের কাজই হলো শিশুদের হৃদয়ে আলো জ্বালানো। চিন্তার খোরাক জুগিয়ে দেওয়া। আমাদের সংস্কৃতির নানাবিধ উপাদানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। আমরা সেই লক্ষে্যই অক্টোবর নভেম্বর থেকে মহড়া শুরু করেছি। অভিভাবকেরা যেভাবে সাহায্য করেছেন তা সত্যি ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। শিশুদের ভালো লেগেছে। ওদের আনন্দমাখা মুখ দেখে সব দ্বিধা কেটে গেছে। এমন আয়োজন আমরা নিয়মিত করতে চাই।

নিজস্ব প্রতিবেদক