স্বজন হারানোর বেদনায় নিঃশব্দ কুমিল্লা
ঘনবসতিপূর্ণ শহর কুমিল্লায় আজ বুধবারের (৩১ ডিসেম্বর) সকাল শুরু হয়েছে গভীর বিষাদের ছায়া নিয়ে। প্রকৃতি যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন, যেন শহরটি তার সবচেয়ে আপন কাউকে হারিয়েছে। এর কারণ সবারই জানা- দেশের প্রথম নারী ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গতকাল মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় ইন্তেকাল করেছেন।
এই খবরটি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো আঘাত করেছে দলীয় নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের মনে। মঙ্গলবার মৃত্যুর সংবাদ আসার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও বুধবার দিনভর সেই শোক কাটেনি; পুরো শহর এখনও শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে। বুধবার ভোর ৬টায় নগরীর ঘুম ভাঙলেও কোথাও ছিল না চিরচেনা কোলাহল। ধর্মসাগর পাড়ে প্রাতঃভ্রমণে আসা মানুষজনও যেন নীরবে হেঁটে চলছেন।
টাউন হলে ব্যস্ত পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের চোখেমুখেও ছিল স্পষ্ট বিষণ্নতা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ব্যস্ত এই শহর আজ তার স্বাভাবিক রূপে নেই। জরুরি পণ্যের দোকান ছাড়া প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই ছিল বন্ধ। রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাতেও ছিল না যাত্রী নিয়ে নিয়মিত তাড়াহুড়ো।
টাউন হল এলাকা থেকে একের পর এক যাত্রীবাহী বাস ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছিল। মঙ্গলবার দুপুর থেকেই বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দলে দলে ঢাকার পথে রওনা হয়েছেন এবং এই স্রোত বুধবার সকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, ‘আমাদের দলের মমতাময়ী মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। সবার মন ভারাক্রান্ত, তাই জানাজায় অংশ নিতে সবাই ঢাকায় ছুটছেন।’
মঙ্গলবার ভোরে মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ সড়কের পাশে দলীয় কার্যালয়ে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও শোকবইয়ে স্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করা হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামনে কালো ব্যানারে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে শোকবার্তা টাঙানো হয়।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম এই মৃত্যুকে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেন। এমনকি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মাঝেও ছিল শোকের ছায়া।
কান্দিরপাড় এলাকার অটোরিকশাচালক জালাল আহমেদ জানান, সংসারের অভাব না থাকলে শোকের এই দিনে তিনি রাস্তায় বের হতেন না।
ঢাকায় নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ চলে গেলেও বুধবার বাদ আসর কুমিল্লা টাউনহলে খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়, যেখানে অসংখ্য মানুষ অংশ নেন।
জানা যায়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চাকরিসূত্রে খালেদা জিয়া কিছুদিন কুমিল্লা নগরীর ঝাউতলা এলাকায় বসবাস করেছিলেন। কুমিল্লাকে নিয়ে তিনি বিশেষ স্বপ্ন দেখতেন এবং ২০১৪ সালে টাউনহলের জনসভায় তাঁর সরব উপস্থিতি এখনও কুমিল্লার মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। তবে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের একটি বাস। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি উপহার দিয়েছিলেন। ৩২ বছর পেরিয়ে গেলেও ‘সাদা রঙের ওপর বেগুনি ডোরাকাটা’ সেই বাসটি এখনও সচল।
প্রায় ৩০ হাজার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী কৃতজ্ঞচিত্তে সেই উপহারের কথা স্মরণ করছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন স্মৃতিচারণ করছেন।
তৎকালীন ছাত্র সংসদের ভিপি মজিবুর রহমান জানান, গণভবনে গিয়ে খালেদা জিয়ার হাত থেকেই তিনি বাসের চাবি গ্রহণ করেছিলেন। বর্তমানে ৫০ আসনের এই বাসটি শিক্ষার্থীদের জন্য চলাচল করছে, যা আজও তাঁর স্মৃতির বাহক হয়ে টিকে আছে।

মাহফুজ নান্টু, কুমিল্লা