স্মৃতিসৌধে যাওয়ার পথে অভাবনীয় ভালোবাসায় সিক্ত তারেক রহমান
দেশে ফিরে বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) পূর্বাচল ৩০০ ফিটে লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দ্বিতীয় দিনে গতকাল শুক্রবারও (২৬ ডিসেম্বর) বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাভার স্মৃতিসৌধে যাওয়ার পথে পথে অভাবনীয় ভালোবাসার সাক্ষী হয়েছেন বিএনপির দ্বিতীয় শীর্ষ এই নেতা।
সংসদ ভবন (শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি) এলাকা থেকে সাভার স্মৃতিসৌধের যাওয়ার পথে রাস্তার দুই পাশে হাত নেড়ে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান নেতাকর্মীরা। ১৯ বছর ৩ মাস পর সাভার স্মৃতিসৌধে আসেন তারেক রহমান। এর আগে ২০০৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেছিলেন তিনি।
এবার এলেন, দেখলেন, জয় করলেন লাখো মানুষের ভালোবাসা। স্মৃতিসৌধের পবিত্র মাটিতে দাঁড়িয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যক্ত করলেন বিনম্র শ্রদ্ধা।
সন্ধ্যা পেরিয়ে তখন রাতের দ্বিপ্রহর। আঁধার গ্ৰাস করে নিয়েছে চারপাশ। তা সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষের প্রাণ চাঞ্চল্যময় উপস্থিতির অন্য এক আলোয় আলোকিত গোটা এলাকা। রাত ১০টা ৫ মিনিটে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছে তারেক রহমানকে বহন করা লাল সবুজ রঙে সাজানো বাসটি। ২০ মিনিট অবস্থান শেষে ১০টা ২৫ মিনিটে জাতীয় স্মৃতিসৌধের মূল ফটক ত্যাগ করেন।
এর আগে পথে পথে হাজারো মানুষের হৃদয় সিক্ত ভালোবাসায় আমিনবাজার থেকে ২৫ কিলোমিটার অতিক্রম করে স্মৃতিসৌধে পৌঁছাতে সময় লাগে ৩ ঘণ্টা ৯ মিনিট। স্মৃতিসৌধের ইতিহাসে অনেকটা নজিরবিহীন তারেক রহমানের এই স্মৃতিসৌধ যাত্রা।
বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদ জাতীয় স্মৃতিসৌধে তাঁর পৌঁছানোর কথা থাকলেও বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত শেষে সাভারের উদ্দেশে রওনা দিতেই ততক্ষণে সময় গড়িয়ে যায় বিকেল পাঁচটা।
নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে সূর্যাস্তের আগে শ্রদ্ধা জানাতে হয়। নামিয়ে ফেলতে হয় জাতীয় পতাকা। তারেক রহমান তখনো মিরপুর রোডে থাকায় তাঁর পক্ষে বিকেল ৫টা ৬ মিনিট শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ডক্টর আব্দুল মঈন খান, বিএনপির চেয়ারপারসন উপদেষ্টা কাউন্সিল সদস্য আমানউল্লাহ আমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক, সাধারণ অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী, ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু, ধামরাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলহাজ তমিজ উদদীন, যুবদল নেতা ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদ, আইয়ুব খান, মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর ও মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।
নেতাকর্মী বেষ্টিত তারেক রহমানের বহনকারী বাসটি ধীরগতিতে মিরপুর সড়ক ধরে মহানগর ছাড়িয়ে সাভারের সীমানা আমিন বাজারে যখন পৌঁছে তখন ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা ৬টা ৫৬ মিনিট। মিরপুর রোড ধরে চলে আসা ধীরগতিতে চলা বাসটি আমিন বাজারে সড়কের দুপাশে সমবেত হওয়া জনতার শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়ে গতি পায়।
সালেহপুর ব্রিজ অতিক্রম করার পর সড়কে উঠে আসা নেতাকর্মীদের জটলার কারণে আবারও থমকে যায় বাসের গতি। এ সময়ে অগ্রবর্তী দলে থাকা চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্সের (সিএসএফ) সদস্যদের নিরাপত্তা রক্ষায় হিমশিম খেতে দেখা যায়।
বাসটি ভাকুর্তা ব্রিজের সামনে আসতেই ফের নেতাকর্মীদের বাঁধার মুখে থমকে যায়। এ সময় সেনা সদস্যদের তৎপরতায় ফের গতি পায় বাসটি। বলিয়ারপুর,আলমনগরেও দেখা যায় অভিন্ন চিত্র।
হেমায়েতপুরে পৌঁছে বড়সড় জটলার মুখে পড়ে বাসটি। এসময় বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানুল্লাহ আমান, তার ছেলে ঢাকা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার ইরফান ইবনে আমান অমির পক্ষে স্লোগান দিয়ে তারেক রহমানকে স্বাগত জানায় নেতাকর্মীরা।
ভিড় ঠেলে ধীরগতিতে একটু এগিয়ে যেতেই যুবদল নেতা শাওন সরকারের পক্ষে স্লোগান দিয়ে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এ সময় তারেক রহমানের বাসটি বেষ্টনী করে বাসের সামনে হেঁটে হেঁটে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে দেখা যায় সেনা সদস্যদের।
জোড়পুল অতিক্রমের সময় রাস্তার দুপাশে দেখা যায় অগণিত নারী ও পুরুষদের। রাস্তার আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে এ সময় নারীদের বিশেষ করে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের মোবাইল হাতে তারেক রহমানের ছবি তুলতে দেখা যায়।
রাজ ফুলবাড়িয়া পৌঁছানোর আগেই বাসটি সামান্য গতি পেতেই নিরাপত্তা জনিত কারণে তারেক রহমান নিজেই তার পাশে থাকা বাসের আলো নিভিয়ে ফেলেন। পরক্ষণেই ফের অগুনতি মানুষের জটলার মুখে পড়ে আলো জ্বালান নিজেই। এ সময়ে আমান উল্লাহ আমান ও ব্যারিস্টার অমির পক্ষে স্লোগান দেওয়া হয়।
এ সময় সামনে ও পাশে থাকা জনতার অভিবাদনের জবাব দিতে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দুহাত উঁচিয়ে আর কখনো দুহাত এক করে প্রার্থনায় রাখার অনুরোধ জানাতে দেখা যায় তারেক রহমানকে।
ব্যাংক টাউন, কর্ণপাড়া, উলাইল, গেন্ডা, থানা স্ট্যান্ড, পাকিজা মোড় পায়ে হাঁটা গতিতে অতিক্রম করতে হয় তারেক রহমানের গাড়ি বহরকে। এ সময় দলীয় পতাকা উঁচিয়ে ‘জিয়া, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।
রাত ৯টা ৫ মিনিটে সাভার বাজার বাস স্ট্যান্ড অতিক্রম করে তারেক রহমানের গাড়িবহর। আমিন বাজার থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের গাড়ি বহরকে ঘিরে ধীরগতিতে চলা যানবাহনের কারণে আরিচা মুখো যান চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। দূরপাল্লার বাস যাত্রীদের পোহাতে হয় বেশ ভোগান্তি। সন্ধ্যা গড়াতেই স্মৃতিসৌধের সামনের মহাসড়ক ঢেকে যায় জনস্রোতে। এ ছাড়াও নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়াতে জাতীয় স্মৃতিসৌধের আগে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রীরা।
বাসটি ঘিরে মহাসড়কের দুপাশে ছিল নেতাকর্মীদের উপচেপড়া উপস্থিতি। নেতাকর্মীদের মুহুর্মুহু স্লোগানের বিপরীতে বাসের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে অভিবাদনের জবাব দেন তারেক রহমান। ক্লান্তিহীনভাবে হাস্যোজ্জ্বল মুখে তারেক রহমানকে কখনো উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে সালাম, কখনো দুহাত একত্র করে ইশারায় প্রার্থনা জানানোর অনুরোধ জানাতে দেখা যায়।
তারেক রহমানের বাসের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলায় ব্যতিব্যস্ত শত শত নেতাকর্মীদের মোবাইল ফোনের আলোয় তৈরি হয় ভিন্ন এক আবহ।
এদিকে শুক্রবার ভোর থেকেই সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে জড়ো হতে থাকেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। কারও হাতে দলীয় পতাকা, কেউ ব্যানার ও পোস্টার নিয়ে উপস্থিত হন প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখতে।
চট্টগ্রামের খুলশি থেকে এসেছিলেন ছাত্রদল কর্মী মাহফুজ আলম। তিনি বলেন, তারেক রহমানের সংবর্ধনায় যোগ দিতে বিশেষ ট্রেনে চেপে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। পুরোটা পথ দাঁড়িয়ে এসেছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ভোর থেকেই স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কারণ আমাদের কাছে তারেক রহমান মানেই আগামীর বাংলাদেশ,আমাদের আবেগ এবং আমাদের ভালোবাসা। রাজশাহী থেকে এসেছিলেন জমশেদ আলী। তার হাতে দলীয় পতাকা। আগের রাতেই অবস্থান নেন তিনি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসেছেন জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে।
এদিকে সকাল ১১টায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসতে থাকেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে। সেখানে নিরাপত্তায় নিয়োজিত ১৫০০ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে শুরু হয় ব্রিফিং। এদের অনেকেই এসেছেন ঢাকার পার্শ্ববর্তী মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ আশপাশের জেলা থেকে।
স্মৃতিসৌধ ঘিরে ভোর থেকেই নেওয়া হয়েছিল কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। আর্মড পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, পুলিশ, র্যাব ছাড়াও মোতায়েন করা হয় বিজিবি সদস্যদের। বিকেল দেড়টার দিকে বিএনপির বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা প্রবেশ করতে থাকেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও তাঁর পুত্রবধূ বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য নিপুণ রায়সহ শীর্ষ নেতারা স্মৃতিসৌধে অভ্যন্তরে প্রবেশ করে অপেক্ষা করতে থাকেন তারেক রহমানের জন্য। এরই মধ্যে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় নিয়োজিত চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্সের (সিএসএফ) সদস্যরা নিরাপত্তার বিষয়টি সমন্বয় করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে।
পরে সার্বিক ঝুঁকি পর্যালোচনার ভিত্তিতে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় স্মৃতিসৌধে তারেক রহমানের নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি ছাড়াও দেখা যায় ডগ ও বোম্ব স্কোয়াডের তৎপরতা।
শুক্রবার বেলা ২টা ৫২ মিনিটের দিকে গুলশানের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তারেক রহমান। দীর্ঘ দুই দশক পর বাবার কবর জিয়ারত করেন তিনি।

জাহিদুর রহমান