প্রশিক্ষণ হবে প্রবলেম সলভিং : প্রধান উপদেষ্টা
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণকে হতে হবে প্রবলেম সলভিং বা সমস্যা সমাধানের আলোকে। একেকজন একেকটি সমস্যা সমাধানে দক্ষ, যে যেটাতে দক্ষ তার কাছে বাকিরা শিখে নেবে। পাশাপাশি আমাদের ভালো ভালো ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
আজ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে তার কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় তিনি এ কথা বলেন।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকারের সার্ভিসে, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে কোনো দুর্নীতি থাকবে না। এটা আমাদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে। এমনভাবে ব্যবস্থা, ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে যাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যেকোনো সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন হয়ে যায়; এ রুম থেকে ও রুমে ফাইল যেন ঝুলে না থাকে। প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, এজন্য যা যা প্রশিক্ষণ প্রয়োজন সেটার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য একটাই নাগরিক কোনো ব্যক্তির কাছে যাবে না, সরকারের কাছে যাবে না। সরকারের সার্ভিস পৌঁছে যাবে নাগরিকের কাছে।’
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘দেখা যায়, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে, ভবন আছে, কিন্তু দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই। প্রশিক্ষণ পদ্ধতি, শিক্ষার বিষয় পুরোনো আমলের, আপটুডেট না। সেজন্য প্রশিক্ষণ হচ্ছে না, প্রশিক্ষণ হলেও কিন্তু কোনো ফল চোখে দেখা যাচ্ছে না। এই ব্যবস্থার মধ্যে প্রযুক্তি আনতে হবে। প্রশিক্ষণ কয়বার হলো, কে কত নম্বর পেল সেটা দিয়ে তাঁকে মূল্যয়ন করতে হবে। ভালো নম্বর পেলে, প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় স্থানে থাকলে তাঁকে ইনসেনটিভ দিতে হবে যাতে সে উৎসাহ পায়।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘গৎবাঁধা ট্রেইনিং না। প্রশিক্ষণ হবে প্রবলেম সলভিং। একেকজন একেকটি সমস্যা সমাধানে দক্ষ, যে যেটাতে দক্ষ তার কাছে বাকিরা শিখে নেবে। আমাদের ভালো ভালো ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও র্যাংকিং করতে হবে; প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় থাকবে। বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের জন্য যেতে পারবে। ভালো প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা যেন গর্ববোধ করতে পারে।’
বৈঠকে কমিটির সদস্যরা জানান, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং তাদের চলমান কার্যক্রম মূল্যায়নে এটিই বাংলাদেশে প্রথম উদ্যোগ হওয়ায় মূল্যায়ন কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড ঠিক করা, মানদণ্ড পরিমাপের জন্য সূচক নির্ধারণ, পরিমাপ কৌশল এবং পরিমাপ স্কেল ঠিক করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ ছিল। এ কারণে ‘লার্নিং বাই ডুয়িং’ পদ্ধতি অনুসরণ করে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে এবং প্রতিটি পর্যায়ে যথাযথ অংশীজনের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। এ কার্যক্রম সম্পাদনের লক্ষ্যে একাডেমিয়া, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া, নীতি সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটি জানায়, সকল অংশীজনের মতামত/পরামর্শ/দিক-নির্দেশনার আলোকে মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। আলোচ্য মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি যথাযথ উত্তম চর্চা অনুসরণ করে প্রণয়ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্তৃক অনুসরণীয় পদ্ধতি/মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি কার্যকর প্রতিবেদন নিশ্চিতে এর প্রায়োগিক দিকসমূহও বিবেচনা করা হয়েছে যেন এর আলোকে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর উন্নয়ন সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে পর্যায়ভিত্তিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা অনুসারে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহের গুণগত মান বৃদ্ধির কৌশল, তাদের বিদ্যমান সমস্যাসমূহ উত্তরণের উপায় প্রভৃতি বিষয় এ প্রতিবেদনে সন্নিবেশ করা হয়েছে।
আলোচ্য মূল্যায়ন কাঠামোর আলোকে ভবিষ্যতেও মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে। প্রয়োজনে এটিকে আরও সমৃদ্ধ করা যাবে। এ প্রতিবেদনের আলোকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উন্নয়নে এখন থেকেই উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারবে। জিআইইউ-এর সহযোগিতায় প্রতিবেদনের সুপারিশমালা বাস্তবায়নে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। আশা করা যায় যে, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহের গুণগত মান উন্নয়ন করা গেলে সরকারি কর্মচারীদের আরও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা যাবে যা জনগণকে সেবা প্রদানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিল-এর ৯ম সভায় জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং তাদের চলমান কার্যক্রম মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানসমূহের মান উন্নয়নের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশনা দেন। নির্দেশনার আলোকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ)-কে বর্ণিত কার্যক্রম সম্পাদনের দায়িত্ব প্রদান করা হয় এবং জিআইইউ-এর কার্যপরিধি পুনর্বিন্যাস করা হয়।
আজ বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর কারিগরি সহায়তায় জিআইইউ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন কার্যক্রম সম্পাদন করেছে। প্রাথমিকভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত পাঁচটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান- বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি), বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, বিয়াম ফাউন্ডেশন, জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি (নাডা) ও জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি (এনএপিডি)-কে এ মূল্যায়নের জন্য বিবেচনা করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারণ করা হবে।
বৈঠকে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক সিনিয়র সচিব লামিয়া মোরশেদ, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব সাইফুল্লাহ পান্না, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি মহাপরিচালক সিদ্দিক জোবায়েরসহ আরও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

নিজস্ব প্রতিবেদক