গুলশানের বাড়ি হারালেন মওদুদ
রাজধানীর গুলশানে সাড়ে তিন বিঘার ওপর নির্মিত বাড়িটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) ফেরত দিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এর ফলে বাড়িটি আর তাঁর মালিকানায় থাকল না।
আদালত একই সঙ্গে মওদুদ আহমদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা এ-সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলা বাতিল করেছেন।
আজ মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় দেন।
এ রায়ের ফলে রাজধানীর গুলশান-২-এর ১৫৯ নম্বর প্লটের বাড়িটি মওদুদ আহমদের ভাই মনজুর আহমদের নামে মিউটেশন (নামজারি) করতে হবে না। তাই ভাইয়ের নামে দখল করা বাড়িটি মওদুদকে ছাড়তে হবে।
রায়ের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানান, মনজুর আহমদের নামে নামজারি করতে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বাতিলে রাজউকের করা আপিল মঞ্জুর করেছেন আদালত। তবে দুদকের মামলাটির অভিযোগ আমলে নেওয়া বৈধ বলে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে মওদুদ ও তাঁর ভাই মনজুরের করা আপিল নিষ্পত্তি করে মামলাটি বাতিলের আদেশ দেন আপিল বিভাগ।
রায়ের পর মওদুদ আহমদ বলেন, ‘সাত বছর পর প্রতিহিংসাবশত সরকার আপিল করেছে। ১৯৮১ সাল থেকে আমরা এ বাড়িতে থাকি। এটা ক্রয় করা বাড়ি। সরকারের বাড়ি নয়। আপিল বিভাগের রায় দেখে আমরা অবশ্যই রিভিউ করব।’
মওদুদ আহমদ বলেন, আপিল বিভাগে একই বিষয়ে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় দুদক মামলা করেছিল। তাই সেটা আজকে বাতিল করেছেন আপিল বিভাগ।
রাজউকের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মওদুদ আহমদের ভাইকে উচ্ছেদের জন্য সরকার মামলা করেনি। মওদুদ আহমদের ভাই নিজেই মামলা করেছেন। কাজেই এখানে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও উদ্দেশ্য নেই। নিম্ন আদালতে তাঁরা হেরে গিয়ে উচ্চ আদালতে এসেছেন। সেখানে মওদুদ আহমদরা জিতেছেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, ‘হাইকোর্ট মওদুদ আহমদের ভাই মনজুর আহমদের নামে বাড়িটি নামজারি করতে রাজউককে নির্দেশ দিয়েছিলেন। হাইকোর্টের আদেশের পর আমি অস্ট্রিয়াতে যাই। সেখান থেকে বাড়ির মালিক অস্ট্রীয় নাগরিক ইনজে মারিয়া প্লাজের মৃত্যুর সনদ নিয়ে আসি। আমরা আপিল বিভাগে দেখাতে সক্ষম হয়েছি যে ওই মওদুদ আহমদের ভাই যে তারিখে চুক্তিনামা করেছিলেন, তার আগে মারিয়া মারা গেছেন।’
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা বলেন, ১৯৭৩ সালে মওদুদ আহমদকে বাড়িটি দেখাশোনা করার জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়েছিলেন মারিয়া। কিন্তু তিনি তাঁর ভাইয়ের নামে ডিক্রি ও মিউটেশনের (নামজারি) আদেশ নিয়েছেন। আজকে এ দুটি বিষয় আপিল বিভাগ বাতিল করেছেন।
মাহবুবে আলম বলেন, ‘রাজউকের মূল আপিল তামাদি হওয়ার কারণে খারিজ হয়েছিল। আমরা এ খারিজাদেশের বিষয়ে রিভিউ করেছি। সেটা মঞ্জুর হয়েছে।’
এ রায়ের ফলে মওদুদের ভাইয়ের সম্পত্তির (বাড়ি) দাবি অগ্রাহ্য। তাঁরা যে এখন বসবাস করছেন, তা অবৈধ দলখদার বলে গণ্য হবে।
উচ্ছেদের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, নিশ্চয়ই রাজউক আইন অনুসারে পদক্ষেপ নেবে। তিনি (মওদুদ) রিভিউ করবেন, সেটা আইনের বিষয়। এদিকে, রাজউক ও সরকার পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে নেবে।
নামজারি
এক আবেদনের শুনানি নিয়ে ২০১০ সালের ১২ আগস্ট ওই বাড়ি মনজুর আহমদের নামে মিউটেশন করার জন্য হাইকোর্ট রায় দেন।
রাজউক এ রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দায়ের করে ২০১১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ আপিল বিভাগ রাজউককে আপিলের অনুমতি দেন। এরপর চলতি বছর এ মামলার শুনানি শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।
দুদকের মামলা
২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাড়িটি নিয়ে দুদকের উপপরিচালক হারুনুর রশীদ রাজধানীর গুলশান থানায় মওদুদ আহমদ ও তাঁর ভাই মনজুর আহমদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
২০১৪ সালের ১৪ জুন এ মামলায় অভিযোগ আমলে নেন বিচারিক আদালত। এর বিরুদ্ধে তাঁদের আবেদন গত বছরের ২৩ জুন খারিজ করে দেন হাইকোর্ট।
পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন মওদুদ আহমদ। এ আবেদনের শুনানি শেষ হওয়ার পর রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন আপিল বিভাগ। মঙ্গলবার দুটি বিষয়ে রায় দেন আপিল বিভাগ।
দুদকের করা মামলার অভিযোগে বলা হয়, বাড়িটির প্রকৃত মালিক ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক মো. এহসান। ১৯৬০ সালে তৎকালীন ডিআইটির (রাজউক) কাছ থেকে এক বিঘা ১৩ কাঠার এ বাড়ির মালিকানা পান এহসান। ১৯৬৫ সালে বাড়ির মালিকানার কাগজপত্রে এহসানের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী অস্ট্রীয় নাগরিক ইনজে মারিয়া প্লাজের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্ত্রীসহ ঢাকা ত্যাগ করেন এহসান। তাঁরা আর ফিরে না আসায় ১৯৭২ সালে এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়।
এর পর ১৯৭৩ সালের ২ আগস্ট মওদুদ তাঁর ইংল্যান্ডপ্রবাসী ভাই মনজুরের নামে একটি ভুয়া আমমোক্তারনামা তৈরি করে বাড়িটি সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ নেন বলে মামলায় অভিযোগ করে দুদক।
বিভিন্ন সময়ে আদালতে মওদুদ ও তাঁর ভাই মনজুর আহমদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল প্রয়াত মাহমুদুল ইসলাম, আজমালুল হোসেন কিউসি, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও এ জে মোহাম্মদ আলী।
আজ রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। আর বিবাদী পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ নিজে।

নিজস্ব প্রতিবেদক