‘প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া পেশাভিত্তিক সংগীত চর্চা টেকসই হয় না’
তরুণ সংগীতশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী রতন মজুমদার বাংলা গানের বিভিন্ন ধারা নিয়ে গবেষণা করছেন। সংগীত নিয়ে তাঁর স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা জানাতে এনটিভি অনলাইনের মুখোমুখি হয়েছেন রতন মজুমদার।
প্রশ্ন: পেশাভিত্তিক সংগীতচর্চাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
উত্তর: পেশাভিত্তিক সংগীত চর্চা বলতে সংগীতকে কেবল শখ বা বিনোদনের জায়গায় সীমাবদ্ধ না রেখে একটি সুসংগঠিত পেশা হিসেবে গ্রহণ করা বোঝায়। যেখানে একজন শিল্পীর অর্থনৈতিক সুরক্ষার পাশাপাশি সামাজিক মর্যাদাও নিশ্চিত হবে।
প্রশ্ন: পেশাভিত্তিক সংগীত চর্চা গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব কতটুকু?
উত্তর: সংগীত গুরুমুখী বিদ্যা। মূলত সকল বিদ্যাই গুরুমুখী। যেকোনো বিষয়ে গভীর ধারণা পেতে দীর্ঘ সময় ধরে অভিজ্ঞ গুরু, শিক্ষক বা তত্ত্বাবধায়কের সান্নিধ্যে থেকে পদ্ধতিগতভাবে অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে কাঙিক্ষত ফলাফল পেতে হয়। প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীকে কাঠামোবদ্ধ জ্ঞান, তাত্ত্বিক ভিত্তি ও শৈল্পিক শৃঙ্খলা প্রদান করে। সংগীত একটি পরিবেশন শিল্প। সময়ের পরিক্রমায় এই পরিবেশনার বাহ্যিক পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। সংগীতের গন্ডি এক সময় ছিল দেবালয় থেকে রাজদরবার। আধুনিক সমাজে সকল ধারার সংগীত, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ উপভোগ করার অধিকার রাখে। আমাদের উদ্দেশ্য যেহেতু পেশাভিত্তিক সংগীত চর্চা, সেহেতু সংগীতকে একটি প্রোডাক্ট হিসেবে গণ্য করতে হচ্ছে। যার ভোক্তা ও ক্রেতা সমাজের উচুতলা থেকে নিচুতলা পর্যন্ত। এই ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে আমাদের মিউজিক মার্কেটিং প্রয়োজন। আর এই মার্কেটিং শক্তিশালী করতে প্রয়োজন পড়ে যুগোপযোগী কম্পোজিশনসহ অডিও ও ভিডিও প্রোডাকশন সম্পর্কিত সকল প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার জানা, বোঝা ও প্রয়োগ করা। এই প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা ও সুযোগ সবচেয়ে বেশি রয়েছে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। ব্যক্তি পর্যায়ে সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে একজন সংগীত শিক্ষার্থীর এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ধারণা লাভ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
আমি মনে করি প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষা ছাড়া পেশাভিত্তিক সংগীত চর্চা টেকসই হয় না। প্রতিভা জন্মগত হতে পারে কিন্তু আন্তর্জাতিক মানে নিজেকে উপস্থাপন করতে হলে কাঠামোবদ্ধ শিক্ষা, গবেষণা ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ জরুরি। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়-এই তিন স্তরেই বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে সংগীতকে গুরুত্বের সাথে পড়ানো দরকার।
প্রশ্ন: কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীতের সিলেবাস আপনি কতটা সময়োপযোগী মনে করেন?
উত্তর: আমাদের বর্তমান সিলেবাসে শাস্ত্রীয় ও তাত্ত্বিক দিক তুলনামূলক শক্তিশালী হলেও পেশাগত ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। লোকাল ও ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক বা এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রির ডিমান্ড অনুযায়ী নিয়মিত সিলেবাস ও শিখন পদ্ধতি পরিবর্তন করার প্রয়োজন আছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করতে গেলে শুধু গান জানা যথেষ্ঠ নয়; সংগীতের সামগ্রিক কাঠামো সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হয়।
প্রশ্ন: যুগোপযোগী সিলেবাস বলতে আপনি কোন কোন বিষয়ের ওপর জোর দিতে চান?
উত্তর: সময়ের দাবি অনুযায়ী সংগীত শিক্ষার সঙ্গে কিছু বিষয় যুক্ত করা অতি প্রয়োজন। যেমন: মিউজিক মার্কেটিং, মিউজিক কম্পোজিশন ও অ্যারেঞ্জমেন্ট, মিউজিক্যাল সফটওয়্যার ম্যানেজমেন্ট। বর্তমানে সংগীত পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর একটি শিল্প। স্টুডিও রেকর্ডিং, লাইভ কনসার্ট, অনলাইন কন্টেন্ট-সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি অপরিহার্য। তাই, স্টাফ নোটেশন, ডিজিটাল কম্পোজিশন, লাইট ও সেট ডিজাইনের মতো বিষয়গুলো পাঠ্যসূচিতে থাকলে আমাদের শিক্ষার্থীরা কেবল দেশীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তারা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যাল, প্রোডাকশন হাউস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারবে।
প্রশ্ন: লাইট ও সেট ডিজাইনের মতো বিষয়গুলো সংগীত শিক্ষায় যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা কেন?
উত্তর: মঞ্চে সংগীত পরিবেশনা এখন শুধু শ্রবণনির্ভর নয়। এটি একটি ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতাও বটে। লাইট ও সেট ডিজাইন সম্পর্কে ধারণা থাকলে একজন শিল্পী ও পরিচালক পুরো পারফরম্যান্সকে আরও নান্দনিক ও পেশাদারভাবে উপস্থাপন করতে পারে।
প্রশ্ন: লোকসংগীত ও দেশীয় ধারার গানের ক্ষেত্রে এই আধুনিক সিলেবাস কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?
উত্তর: আমাদের যদি কোনো অমূল্য সম্পদ থাকে তা হলো লোকসংগীত। আমাদের দেশের লোকসংগীতের মতো রত্নভাণ্ডার আর কোনো জাতির আছে বলে মনে হয় না। এই মুহূর্তে একটি গানের কথা মনে পড়ছে; ‘এই মাটিতে ঘুমায় কত পির ফকির আউলিয়া/ হাজার হাজার মরমীয়া কত দরদীয়া/তারাই বানাইলো হাসন, লালন, রবী ঠাকুর, নজরুল/ জীবনানন্দ, জসীমউদ্দিন, কবিতার বুলবুল।’ লোকসংগীতকে বিশ্বদরবারে নতুনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। সঠিক কম্পোজিশন, নোটেশন ও মার্কেটিং জানলে আমাদের লোকসংগীতের স্বকীয়তা বজায় রেখেই আন্তর্জাতিকভাবে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। একই সাথে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচিত হবে।
প্রশ্ন: কেমন সংগীত শিক্ষা ব্যবস্থার দেখতে চান?
উত্তর: আমি এমন একটি সংগীত শিক্ষা ব্যবস্থা দেখতে চাই, যেখানে শেকড় থাকবে দেশীয় ঐতিহ্যে আর আর দৃষ্টি থাকবে বিশ্বমুখী। একজন শিক্ষার্থী ক্লাসরুম থেকেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠবে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে পেশাভিত্তিক সংগীত শিক্ষা ও চর্চায় প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
উত্তর: সংগীত শিক্ষাকে এখনো সহ-পাঠ্য বিবেচনা করা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও অবকাঠামোর অভাব। সর্বোপরি, সংগীতকে পেশা হিসেবে সামাজিক স্বীকৃতির স্বীমাবদ্ধতা।
প্রশ্ন: এই চ্যালেঞ্জ উত্তরণের পথ কী?
উত্তর: স্কুল-কলেজে সংগীত বাধ্যতামূলক করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক পাঠক্রম চালু করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং সবচেয়ে জরুরি সংগীতভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। সংগীতকে সহ-পাঠ্য হিসাবে নয়, মূল ধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা। যুগোপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে সংগীত শিক্ষার্থীরাই একদিন বাংলাদেশর সাংস্কৃতিক দূত হয়ে উঠবে।
পেশাভিত্তিক সংগীত চর্চা গড়ে তুলতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষা অপরিহার্য। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ধারাবাহিক ও মানসম্মত সংগীত শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে সংগীত কেবল শিল্প কিংবা বিনোদন নয়, একটি সম্মানজনক ও টেকসই পেশা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হবে।
